গুয়াহাটি বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক এক্সপোর্ট হাব বানানোর বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২৭ অক্টোবরঃ অসমের সুগন্ধি অগরু কাঠ এবার ভরিয়ে তুলবে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ-বাতাস। আন্তর্জাতিক বাজারে অসমের ঐতিহ্যবাহী অগরুর বিপুল চাহিদাকে পুঁজি করে রাজ্যের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল রাজ্য সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘এক জেলা, এক পণ্য’ (ওডিওপি) কর্মসূচির অধীন গোলাঘাট জেলায় উৎপাদিত ১২৩ কিলোগ্রাম মূল্যবান অগরু কাঠের চিপস দুবাইয়ে রপ্তানির উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার গুয়াহাটির লোকসেবা ভবনের প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই ঐতিহাসিক রপ্তানি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। অগরু চাষকে কেন্দ্র করে অসমের গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, এই পদক্ষেপ তারই এক বাস্তব রূপায়ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি তিনজন অগরু চাষির হাতে আর্থিক অনুদান ও প্রাপ্য মূল্যের চেক তুলে দেন। বিগত দিনে অগরু চাষিরা উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত বাজারদর না পেয়ে প্রায়শই মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের কারসাজির শিকার হতেন। এই পরিস্থিতির চিরতরে অবসান ঘটাতে রাজ্য সরকারের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে ‘এম জে আই গ্রুপ’ ।
সংগৃহীত অগরুর সরাসরি মূল্য এবার থেকে ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ পদ্ধতিতে সোজা কৃষকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আর্থিক লেনদেনে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং কৃষকরা তাঁদের ঘামঝরানো শ্রমের সঠিক মূল্য হাতে পাবেন।
অনুষ্ঠান শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এক বিস্ফোরক অথচ আশাব্যঞ্জক তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, সমগ্র দেশে যত অগরু গাছ রয়েছে, তার প্রায় ৮১ শতাংশই এককভাবে অসমে উপস্থিত। রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ১২ কোটি অগরু গাছ রয়েছে এবং এই চাষের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছেন অন্তত ৫০ হাজার কৃষক।
আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অগরুর কাঠ ও তার থেকে তৈরি আতর বা সুগন্ধি চিপসের যে অস্বাভাবিক চাহিদা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে অগরু একাই রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হয়ে উঠবে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, অগরু চাষ কেবল কৃষকদের ব্যক্তিগত রোজগার বাড়াবে না, বরং তা সার্বিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, সহজ এবং মধ্যস্বত্বভোগীমুক্ত করতে রাজ্য সরকার এক বিশাল পরিকাঠামোগত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, গুয়াহাটির ‘লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানানো হয়েছে।
বর্তমানে কার্গো পরিবহণের জটিলতার কারণে বিভিন্ন বন্দরে মালামাল পাঠাতে যে অতিরিক্ত সময় ও খরচ হয়, গুয়াহাটি বিমানবন্দর সরাসরি আন্তর্জাতিক কার্গো হাব হিসেবে স্বীকৃতি পেলে সেই ঝক্কি অনেকটাই কমে যাবে। ফলে অসমের অগরু চিপস গুয়াহাটি থেকেই সোজা মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
অগরু চাষকে একটি সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে সরকার ইতিমধ্যেই এক উচ্চপর্যায়ের ‘টাস্ক ফোর্স’ গঠন করেছে। রাজ্য সরকারের কৃষি, বন এবং শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগ যৌথভাবে এই টাস্ক ফোর্সের পরিচালনা করছে। অগরু গাছ কাটা, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিদেশের বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে যেসব পুরোনো আইনি জটিলতা বা লাইসেন্সিং সংক্রান্ত সমস্যা ছিল, সেগুলোকে দ্রুত সমাধান করাই এই টাস্ক ফোর্সের মূল কাজ।
উল্লেখ্য, এটি দ্বিতীয়বারের মতো অসম থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে অগরু কাঠের বাণিজ্যিক চালান পাঠানো হলো। প্রাকৃতিক সম্পদ এবং গোলাঘাটের স্থানীয় কৃষকদের বহুদিনের অভিজ্ঞতাকে এক সুতোয় বেঁধে অসমকে বিশ্বমানের ‘অগরু হাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন আসাম সরকারের মূল লক্ষ্য।
সোমবারের এই মর্যাদাপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন অসম সরকারের শিল্প, বাণিজ্য ও সরকারি উদ্যোগ বিষয়ক মন্ত্রী বিমল বড়া, রাজ্য সরকারের একাধিক শীর্ষ পদস্থ আধিকারিক এবং এম জে আই গ্রুপের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। রাজ্যবাসীদের এখন একটাই আশা, অগরুর এই সুবাস যেন কেবল বিদেশের মাটিতেই না ছড়ায়, বরং অসমের হাজার হাজার কৃষক পরিবারের মুখেও হাসির ফুটকি ফুটিয়ে তোলে।





