অমৃতকালে সংসার সামলানোই এখন চাকরি! মোদি জমানায় বিনামূল্যের গৃহশ্রমই সরকারি সফলতার অস্ত্র!

কেয়ার-এজের সাফ কথা, বেকারত্বের হার কমার যে পরিসংখ্যান খাড়া করে সাফল্যের দাবি করা হচ্ছে, তাতে যথেষ্ট জল মেশানো রয়েছে। তথ্যের মারপ্যাঁচে এবং পরিসংখ্যানের কারিকুরিতে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানোর মরিয়া চেষ্টা চলছে। আর এই কারসাজির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল দেশের গৃহবধূদের রাতারাতি ‘রোজগেরে’ বা ‘স্বনিযুক্ত কর্মী’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া! রিপোর্টে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা শুনলে যে কারোরই চোখ কপালে উঠবে।

দেশের যে সমস্ত মহিলারা দিনরাত এক করে সন্তান প্রতিপালন করেন, ঘরের রান্না সামলান কিংবা চার দেওয়ালের মধ্যে সংসারের চাকা ঘোরান কেন্দ্রীয় সরকারের খাতায়-কলমে তাঁরাই নাকি আজ বিরাট ‘স্বনিযুক্ত কর্মী’! এক পয়সা পকেটে না ঢুকালেও, বাজারের থলেতে টান পড়লেও, কর্মসংস্থানের মানচিত্রে তাঁরাই এখন দেশের দিশারী। স্রেফ বেকারত্বের গ্রাফ উর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠার লজ্জা ঢাকতেই এই জাদুকরি পরিসংখ্যানের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে রেটিং সংস্থাটি।

কেয়ার-এজের তথ্য বলছে, গ্রামাঞ্চলে মহিলাদের তথাকথিত ‘স্বনিযুক্তির’ হার নাকি আকাশছোঁয়া, পাবলিক ডোমেনে তা পৌঁছে গিয়েছে রেকর্ড ৭০.৭ শতাংশে। প্রথম নজরে মনে হতেই পারে, গ্রামীণ অর্থনীতি বোধহয় দারুণ চাঙা হয়েছে, যার জেরে কাজ পাচ্ছেন গ্রামের নারীরা। কিন্তু পর্দার আছলের আসল চিত্রটি একেবারেই উলটো। রেটিং সংস্থাটি স্পষ্ট জানাচ্ছে, এই বিশাল সংখ্যক স্বনিযুক্ত মহিলার একটা বড় অংশই আসলে বাড়িতে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমদান করেন। অর্থাৎ, পরিবারের জন্য নিঃস্বার্থভাবে করা সংসারের কাজকেই সরকারি খাতায় ‘কর্মসংস্থান’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে!

কেয়ার-এজের রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রামীণ স্বনিযুক্তির প্রায় অর্ধেক অংশজুড়েই রয়েছে এই অবৈতনিক পারিবারিক শ্রম। গ্রামে কর্মরত মহিলাদের মধ্যে মাত্র ৯.৩ শতাংশ নিয়মিত বেতনের চাকরি করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। অন্যদিকে, শহরে সেই হার সামান্য বেশি হলেও তা মাত্র ৫১ শতাংশ। গ্রামীণ মহিলাদের ২০ শতাংশ ঠিকা বা চুক্তির ভিত্তিতে দিনমজুরি করেন, যেখানে শহরে এই হার মাত্র ৯ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা সুখের নয়। শহরের পুরুষ কর্মীদের ৪৭ শতাংশ নিয়মিত বেতনের চাকুরিজীবী হলেও, গ্রামে সেই হার মাত্র ১৭ শতাংশে এসে ঠেকেছে। বাকিদের ভাগ্যে জুটেছে হয় চাষবাসের অনিশ্চিত জীবন, নতুবা ঠিকা কাজ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই কাজগুলিতে কি বিন্দুমাত্র স্থায়িত্ব বা স্বস্তি আছে?

রিপোর্টে পরিষ্কার বলা হয়েছে, মহিলা ও পুরুষ নির্বিশেষে সিংহভাগ কর্মীর জন্যই এই কাজগুলি সম্পূর্ণ অনিয়মিত। অর্থাৎ, বছরের কিছু নির্দিষ্ট মরশুমে কাজ মিললেও বাকি মাসগুলি কাটাতে হয় চরম অনিশ্চয়তায়। বছরভর নিশ্চিত উপার্জনের মুখ দেখেন না দেশের বিপুল সংখ্যক মেহনতি মানুষ। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, জাতীয় স্তরে মোট মজুরি বা উপার্জনের মাত্র ২০ শতাংশ এসে পৌঁছায় তাঁদের হাতে। অর্থাৎ, গাণিতিক অনুপাতের নিরিখে তাঁরা যে পরিমাণ রক্তজল করা পরিশ্রম করেন, তার সিকিভাগও আর্থিক প্রাপ্তি ঘটে না।

ক্রেডিট রেটিং সংস্থাটি আরও একটি মারাত্মক বিষয়ের প্রতি আঙুল তুলেছে। তারা জানিয়েছে, ভারতে ‘স্বনিযুক্তি’ বা কারও অধীনে কাজ না করে নিজের মতো করে রোজগারের যে হার দেখানো হচ্ছে, তার অর্থ এই নয় যে মানুষ খুব খুশিমনে স্বাধীন ব্যবসা বা পেশায় যুক্ত হয়েছেন। বরং যখন সমাজের বুকে চাকরির বাজার তীব্রভাবে সংকুচিত হয়ে আসে এবং কর্মসংস্থানের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হতে থাকে, তখন পেটের টানে এবং বেঁচে থাকার তাগিদেই বাধ্য হয়ে মানুষ ছোটখাটো স্বনিযুক্তির পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে দেশের মোট কাজের বাজারের ৫২ শতাংশ ধরে রেখেছিল এই স্বনিযুক্তি। কিন্তু করোনাকালের ভয়াবহ অভিঘাত এবং পরবর্তী সময়ে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে তা লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬৮.৪ শতাংশে! গত বছর সেই হার সামান্য কমে ৫৬.২ শতাংশে নামলেও, তা কখনই মহামারী-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায়নি। অর্থাৎ, বেহাল চাকরির বাজারের জেরে মানুষ যে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন, তারই নিখাদ দলিল এটি।

কেন্দ্রীয় সরকার বিশ্বমঞ্চে ভারতের অর্থনৈতিক প্রগতি ও কর্মসংস্থানের ঢাক পেটাতো বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না। অথচ কেয়ার-এজের তথ্য বলছে অন্য কথা। ২০১৮ সালে কাজের বাজারে ভারতীয়দের যোগদানের হার (লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট) ছিল ৪৯.৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৫৯.৩ শতাংশে পৌঁছানোকে যদি সরকার তাদের বিরাট মেডেল বলে দাবি করতে চায়, তবে আন্তর্জাতিক তুলনার মানদণ্ডটি সামনে আনলেই সেই মিথ্যে বেলুন নিমিষে চুপসে যায়। রিপোর্ট জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে গোটা বিশ্বে এই লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেটের বিশ্ব গড় ছিল প্রায় ৬১ শতাংশ।

স্বাভাবিক নিয়মেই এই দৌড়ে ভারত তো বটেই, চিন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপিন্স বা সিঙ্গাপুরের মতো শক্তিধর অর্থনৈতিক দেশগুলোর অনেক এগিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু অত্যন্ত লজ্জার বিষয় হলো, উন্নত দেশ তো দূরের কথা, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডের মতো এশিয়ার তুলনামূলক কমজোরি ও ছোট অর্থনীতির দেশগুলোও কাজের বাজারে যোগদানের ক্ষেত্রে ভারতকে বহুদূর পেছনে ফেলে দিয়েছে। এমনকি, প্রতিবেশী বাংলাদেশও এই সূচকে ভারতকে টেক্কা দিয়ে এগিয়ে গেছে!

সর্বোপরি, কেয়ার-এজের এই সমীক্ষায় এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, মোদি সরকার বিশ্ববাসীর দরবারে কাজের বাজারের যে সুদৃশ্য ও সফল ছবি তুলে ধরে আসছে, তার পুরোটাই আসলে অন্তঃসারশূন্য এবং সাজানো পরিসংখ্যানের মারপ্যাচ। বেকারত্ব ঘোচানোর নামে গৃহিণীদের অবৈতনিক শ্রমকে ‘রোজগার’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারই প্রমাণ দেয় না, বরং দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দুর্দশাকে ধামাচাপা দেওয়ার এক বিপজ্জনক ও মরিয়া প্রচেষ্টাও বটে। দেশের জবুথবু চাকরির বাজার এবং নিম্নগামী বাস্তব চিত্র মোদি জমানার উন্নয়ন তত্ত্বকে আজ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

Related Posts

The Future of Talented Young Doctors Is Being Crushed Under the Wheels of Corporate Hospital Profits, The Noble Mission of Saving Lives Is Now Trapped in a Corporate Cage!

Citizens Raise Their Voices Against the Exploitation of Talented Young Doctors, Forced to Work for Salaries as Low as ₹35,000 a Month By Dr. Nikhil Das Barak Bani Digital Desk,…

দীপাবলির আগে রেলযাত্রীদের জন্য বিরাট উপহার, কাউন্টার থেকে কাটা টিকিটেও কার্যকর হচ্ছে ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২৭ অক্টোবরঃ অনলাইন আর অফলাইনের বৈষম্য এবার ঘুচতে চলেছে ভারতীয় রেলওয়ের টিকিটিং ব্যবস্থায়। এতদিন ধরে কাউন্টার থেকে কেনা টিকিটের যাত্রীরা যে অধিকার ও সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *