বরাকের জীবনরেখা এখন যেন মৃত্যুকূপ! গর্তে হারিয়ে গেছে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক, কাটিগড়া-কালাইন জুড়ে নিত্য চরম দুর্ভোগে লাখো মানুষ

স্থানীয়দের ভাষায়, রাস্তার মধ্যে গর্ত নয়, গর্তের মধ্যে রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে। একাধিক স্থানে বিশালাকার গর্তগুলো এখন ছোটখাটো পুকুরের আকার ধারণ করেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্ত পানিতে ভরে যায়, ফলে কোথায় রাস্তা আর কোথায় খাদ তা বোঝার উপায় থাকে না। প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে এই পথে চলাচল করছেন হাজার হাজার যাত্রী, শিক্ষার্থী, রোগী ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকরা।

সোমবার কাটিগড়া চৌরঙ্গী এলাকায় জাতীয় সড়কের বেহাল চিত্র যেন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সড়কের মাঝ বরাবর সৃষ্টি হওয়া বিশালাকার নালার মতো অংশে একের পর এক যানবাহন আটকে পড়ায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বহু ট্রাক, বাস, অটো ও ব্যক্তিগত গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই ভগ্ন সড়কের কারণে চৌরঙ্গী বাজারের ব্যবসা কার্যত ধ্বংসের মুখে। যানবাহনের চাকার আঘাতে বড় বড় পাথর ছিটকে এসে দোকানে আছড়ে পড়ছে।

ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক ব্যবসায়ী দিনের বেশিরভাগ সময় দোকানের শাটার আংশিক নামিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এক দোকানদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ব্যবসা করব নাকি জীবন বাঁচাব? রাস্তা দিয়ে গাড়ি গেলেই পাথর উড়ে এসে দোকানের টিন, কাঁচ ও মালপত্রে আঘাত করছে। গ্রাহকরাও এখন বাজারে আসতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে চৌরঙ্গী বাজারে ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণেই তাদের দৈনিক আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার দুরবস্থার পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যর্থতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কাটিগড়া চৌরঙ্গীতে প্রশাসনের একাধিক নির্দেশ সত্ত্বেও ফুটপাত দখল করে সবজি ব্যবসা চলছে। অন্যদিকে রাস্তার দুপাশে যাত্রীবাহী অটোর দীর্ঘ লাইন কার্যত সড়ককে সংকুচিত করে ফেলেছে। ফলস্বরূপ, যেখানে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যানবাহন সহজেই চলাচল করতে পারত, সেখানে এখন সামান্য যানচাপেই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যখন প্রশাসন নিজেই অবৈধ দখল ও অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং বন্ধ করতে ব্যর্থ, তখন যানজট কমবে কীভাবে?

শুধু কাটিগড়াই নয়, কালাইন এলাকাতেও একই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। জাতীয় সড়কের দুই পাশে অবৈধ পার্কিং, দোকানপাটের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এবং সড়কের বেহাল অবস্থা মিলিয়ে প্রতিদিন একাধিকবার যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসযাত্রী এবং জরুরি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত এই যানজটে আটকে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো স্কুল-কলেজে পৌঁছাতে না পারায় নিয়মিত ক্লাস মিস করছে। পরীক্ষার দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

সড়কের ভয়াবহ অবস্থা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চালকরা। তাঁদের মতে, বিশালাকার গর্ত এড়াতে গিয়ে প্রায়শই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে ভারী যানবাহন। ফলে যে কোনও মুহূর্তে বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এরই মধ্যে গত শনিবার একটি রডবোঝাই ট্রাক বিশাল গর্ত এড়াতে গিয়ে প্রায় ৫০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যায়। সৌভাগ্যবশত বড় ধরনের প্রাণহানি না ঘটলেও ঘটনাটি গোটা এলাকার মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। এক ট্রাকচালক বলেন, এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানো মানে প্রতিদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা। কখন কোন গর্তে চাকা পড়বে, কখন গাড়ি উল্টে যাবে, কেউ জানে না।

স্থানীয়দের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সংস্কারের নামে যে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের দাবি করা হচ্ছে, তার বাস্তব প্রতিফলন কোথায়? জনসাধারণের অভিযোগ, যদি সত্যিই নিয়মিত সংস্কার ও মেরামতের কাজ হয়ে থাকে, তাহলে জাতীয় সড়কের এই করুণ চেহারা কেন? কেন বর্ষা আসার আগেই রাস্তা ভেঙে পড়ল? কেন প্রতিদিন মানুষকে জীবন বাজি রেখে চলাচল করতে হচ্ছে? অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত হওয়া জরুরি। কারণ জাতীয় সড়কের বর্তমান অবস্থা শুধু অব্যবস্থাপনার নয়, বরং উন্নয়নের দাবির সঙ্গেও এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।

স্থানীয় বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের উদ্যোগে কিছু বড় গর্তে পাথর ফেলা হয়েছে বলে এলাকাবাসী স্বীকার করলেও তাঁদের বক্তব্য, তা সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। কয়েক দিনের মধ্যেই সেই পাথর সরে গিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে রাস্তা। স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে গর্ত ভরাট করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সম্পূর্ণ সড়ক পুনর্নির্মাণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অবৈধ দখলমুক্তকরণ। বরাক উপত্যকার মানুষ আজ জানতে চান, আর কতদিন এই দুর্ভোগ চলবে? আর কত দুর্ঘটনা, কত প্রাণহানি এবং কত আর্থিক ক্ষতির পর প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে?

একসময় উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জাতীয় সড়ক আজ অবহেলা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, দ্রুত স্থায়ী সংস্কার না হলে আগামী দিনে বৃহত্তর গণআন্দোলনের পথেই হাঁটতে বাধ্য হবেন তাঁরা। বরাকের মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ৬ নম্বর জাতীয় সড়কের এই বেহাল চিত্র আর শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, এটি এখন জনস্বার্থ, জননিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার এক বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান ও স্থায়ী সমাধান দেখতে চায়।

Related Posts

ভোট শেষ, সুবিধাও শেষ! নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি উধাও, বন্ধ ১০০ টাকার ডাল-চিনি-লবণ প্রকল্প

রেশন কার্ডধারীদের কপালে বাড়তি খরচের বোঝা, বাজেট সংকটের অজুহাতে অনিশ্চয়তায় লক্ষ লক্ষ পরিবার নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির ঝড়, ভোটের পর বাস্তবতার কঠিন ধাক্কা। অসমের প্রায় ৭০ লক্ষ রেশন কার্ডধারী পরিবারকে স্বস্তি…

ডবল ইঞ্জিন সরকারের জিরো টলারেন্স কি ফাইলবন্দি? ১৫ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকার সংস্কার কোথায়? মরণফাঁদে পরিণত ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক, ক্ষোভে ফুঁসছে বরাক ও তিন রাজ্যের মানুষ

ভাঙাচোরা সড়কে নিত্য দুর্ভোগে রোগী, ছাত্রছাত্রী, যাত্রী ও তিন রাজ্যের পণ্যবাহী যানচালকরা, উঠছে দুর্নীতি তদন্তের দাবি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২মেঃ ডবল ইঞ্জিন সরকারের উন্নয়নের অঙ্গীকার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *