নির্বাচন কমিশন ও এসআইআর বিতর্ক!

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং সুপ্রিম কোর্টের অন্যান্য বিচারপতিদের উদ্দেশে পাঠানো এই চিঠিতে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে যে গুরুতর প্রশ্নগুলি উত্থাপিত হয়েছে, তা অতীতে নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশিষ্টজনদের এই জোরালো চিঠিতে সুপ্রিম কোর্টের কাছে মূলত চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়েছে, এসআইআর-এর বৈধতা এবং গোটা প্রক্রিয়াটি স্বাধীনভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ে না দেখা পর্যন্ত এই সংক্রান্ত সমস্ত কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত রাখা হোক। ভোটার নিবন্ধনের ফর্ম এবং তার সহায়ক সফটওয়্যারে কোনও ধরনের অনুমোদনহীন বা বেআইনি পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না, তার নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে নিয়োগ করা স্বাধীন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ইসিআইনেট এর প্রযুক্তিগত সুরক্ষা, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং আইনি কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর অডিট বা নিরীক্ষা করাতে হবে। এই খোলা চিঠিতে সই করার তালিকায় রয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা, যাঁদের সততা ও দেশপ্রেম সম্পর্কে কারোর মনে সন্দেহের অবকাশ নেই।

এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য নামগুলির মধ্যে রয়েছেন প্রাক্তন নৌসেনা প্রধান অ্যাডমিরাল বিষ্ণু ভাগবত, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ডি হরিপরন্থমন, বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষ, প্রাক্তন সাংসদ জহর সরকার, সমাজকর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব এবং বিশিষ্ট অভিনেতা প্রকাশ রাজ-সহ দুই হাজারের অধিক স্বনামধন্য নাগরিক।

তাঁদের প্রধান প্রশ্ন, স্থানীয় নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকদের আইনসিদ্ধ সাংবিধানিক ক্ষমতা কি কোনও গোপনীয় সফটওয়্যারের মারফত খর্ব করা হয়েছে? ইসিআইনেটে ঠিক কাদের কার প্রবেশাধিকার ছিল এবং এই যান্ত্রিক ত্রুটি বা সফটওয়্যার-নির্ভর পরিবর্তনের জেরে দেশের কতজন বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে, তার সঠিক উত্তর আজও সাধারণ মানুষের অজানা। এই দাবির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে ঠিক তখনই, যখন নির্বাচন কমিশনের অন্দরের কিছু স্পর্শকাতর নথি জনসমক্ষে চলে আসে।

সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী বিগত ১০ মাসের মধ্যে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন একপেশে পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র লিখিত আপত্তি ও প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিশেষ করে ফর্ম ৬-এ যত্রতত্র পরিবর্তন করাকে তাঁরা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অননুমোদিত বলে অভিহিত করেছিলেন। এমনকি, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ তথ্যপ্রযুক্তি জাল বা ইসিআইনেটের নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাওয়া নিয়েও তাঁরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

যদিও এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর নির্বাচন কমিশন প্রথম দিকে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা উড়িয়ে দিয়েছিল। কমিশনের তরফে দাবি করা হয়েছিল যে, লিখিত নোট, মতপার্থক্য এবং প্রশ্ন তোলা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। এসআইআর সহ যাবতীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিন সদস্যের পূর্ণ কমিশন সর্বসম্মতভাবেই নিয়েছে বলে জানানো হয়। কিন্তু বিতর্কের ঝড় থামেনি।

এর ঠিক পরেই, গত ২৬ সেপ্টেম্বর হঠাত্‍ করেই পূর্ণ কমিশনের একটি জরুরি বৈঠকে একাধিক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই বৈঠকে স্থির হয় যে, ইসিআইনেট নতুন করে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হবে। নোটিসপ্রাপ্ত ভোটারদের আর অপমানজনকভাবে বা বাধ্যতামূলকভাবে নির্বাচন দপ্তরে তলব করা হবে না। বুথ স্তরের আধিকারিকেরা সরাসরি ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করবেন। কমিশনের বৈঠকের আলোচ্যসূচি আগাম ভাগ করে নেওয়া এবং প্রতিটি বৈঠকের কার্যবিবরণী কঠোরভাবে নথিবদ্ধ করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নয়টি নতুন সিদ্ধান্তের মধ্যে কমিশনার সান্ধু ও যোশীর পূর্বে তোলা উদ্বেগের স্পষ্ট ছায়া রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে, ফর্ম ৬-এ কীভাবে এবং কার নির্দেশে পরিবর্তন করা হয়েছিল? কিংবা পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার ঝুলে থাকা আপিলের মতো জটিল সমস্যাগুলির সমাধান কীভাবে হবে? কমিশন একদিকে দাবি করছে তাদের আগের সিদ্ধান্তে কোনও গলদ ছিল না, অন্যদিকে সমালোচনার মুখে পড়ে রাতারাতি নিজেদের সফটওয়্যার, শুনানি ও নথি সংগ্রহের পদ্ধতি বদলে ফেলছে।

এই দ্বিমুখী অবস্থানই কমিশনের স্বচ্ছ্বতা নিয়ে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে। প্রাক্তন নৌসেনা প্রধান থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিচারবিভাগীয় ব্যক্তিত্ব ও অর্থনীতিবিদদের এই খোলা চিঠি বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের সোজা সাপটা যুক্তি কমিশন যদি নিজেদের আগের প্রক্রিয়াকেই নির্ভুল বলে মনে করে, তবে বিতর্কের মুখে পড়ে এতগুলি নিয়ম ও পদ্ধতি রাতারাতি সংশোধন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল কেন? স্বচ্ছ নির্বাচন ও গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকে সুরক্ষিত রাখতে কমিশনের অভ্যন্তরীণ আত্মোপলব্ধির ওপর আর ভরসা রাখতে পারছেন না দেশের বিশিষ্টজনেরা।

তাই তাঁরা সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে ইসিআইনেট পরীক্ষা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুললেন। এখন গোটা দেশের নজর সুপ্রিম কোর্টের দিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই অভূতপূর্ব আবেদনে কীভাবে সাড়া দেয়, সেটাই দেখার!

Related Posts

৭.৮ শতাংশ জিডিপি গ্রোথের নেপথ্যে কি তবে শুধুই ফাঁকা আওয়াজ?

শেয়ার বাজারের পতন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামছাড়া দাম সাধারণ মানুষের বাস্তব চিত্রটাকেই সম্পূর্ণ উলটো করে দিচ্ছে। বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের রিয়েল জিডিপি গ্রোথ রেট…

জোটেনি মাথার উপর ছাদটুকু! এক বছর ধরে অন্যের বাড়িতে দিন কাটছে দেশের প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির, নেপথ্যে কোন প্রশাসনিক রহস্য?

আইন অনুযায়ী ‘টাইপ এইট’ বাংলো এবং রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হলেও, এক বছর ধরে হরিয়ানার ফার্মহাউসে কাটাতে হচ্ছে জগদীপ ধনকড়কে। বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ রাজনীতির অন্দরমহলে নাটকীয় পটপরিবর্তন নতুন কিছু…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *