বিজেপির বোর্ড, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট কোথায়?

ফলাফলের হিসাব অনুযায়ী বিজেপির প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৮৯,৮৮১। অর্থাৎ মোট ভোটারের হিসাবে বিজেপির ভোট প্রায় ৩৪.৬৫ শতাংশ। সহজ হিসাবেই বলা যায়, ১০০ জন ভোটারের মধ্যে বিজেপির সঙ্গে ছিলেন প্রায় ৩৫ জন। বাকি প্রায় ৬৫ জনের ভোট বিজেপির পক্ষে যায়নি। তাহলে প্রশ্ন, এই ৩৫ শতাংশের ভোটে কীভাবে নিরঙ্কুশ বোর্ড? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ভারতের প্রচলিত প্রথম-স্থান-ভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্যেই। কোনও ওয়ার্ডে ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়া আবশ্যক নয়।

অন্যদের তুলনায় বেশি ভোট পেলেই জয় নিশ্চিত। ধরা যাক, একটি ওয়ার্ডে বিজেপি পেল ৩৮ শতাংশ ভোট। কংগ্রেস পেল ৩০ শতাংশ। আর তিনজন নির্দল প্রার্থী মিলে পেলেন বাকি ৩২ শতাংশ ভোট। তাহলে বিজেপিই জিতবে। অর্থাৎ বিজেপির জয় নিশ্চিত করতে সব ভোটারের সমর্থন দরকার হয়নি। দরকার হয়েছে বিরোধী ভোটকে এক জায়গায় জমাট বাঁধতে না দেওয়া।

শিলচর পুরনিগম নির্বাচনের ফলাফল অন্তত এই রাজনৈতিক বাস্তবতাটাই সামনে এনেছে।বিজেপির বিরুদ্ধে থাকা ভোটের একটি বড় অংশ কংগ্রেসের দিকে যায়নি। আবার সেই ভোটের উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে নির্দল প্রার্থীদের কাছে। ফলে বহু ওয়ার্ডে বিজেপির বিরুদ্ধে থাকা ভোট বিভক্ত হয়েছে। বিরোধী ভোট যত বেশি ভাগ হয়েছে, বিজেপির জয়ের রাস্তা ততটাই সহজ হয়েছে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক গল্প সম্ভবত বিজেপির জয় নয়, কংগ্রেসের পতন। ৪০টি ওয়ার্ডে কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৩৫,২০৫। মোট ভোটারের হিসাবে যা প্রায় ১৩.৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে নির্দল প্রার্থীরা সম্মিলিতভাবে পেয়েছেন প্রায় ৩৩,৫১০ ভোট। অর্থাৎ প্রায় ১২.৮০ শতাংশ।

একদিকে দেড়শো বছরের পুরনো একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে কোনও দলীয় প্রতীক ছাড়া লড়াই করা একাধিক প্রার্থী। অথচ দু’পক্ষের সম্মিলিত ভোটের ব্যবধান খুব বেশি নয়। এটাই কাছাড় কংগ্রেসের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। একসময় শিলচর ও কাছাড়ের রাজনীতিতে কংগ্রেসের যে শক্তিশালী সংগঠন ও জনভিত্তি ছিল, এই নির্বাচনে তার ছায়াও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।

শুধু ভোট কমেছে এমন নয়, কংগ্রেসের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দলের জায়গা কংগ্রেস ধরে রাখতে না পারলে সেই শূন্যস্থান কে পূরণ করবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। নির্দলদের সম্মিলিত ভোট প্রায় ৩৩,৫১০। একটি দল নয়, কোনও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নয়, কোনও বড় নির্বাচনী প্রতীক নয়। তারপরও এত ভোট। এটাকে শুধুমাত্র ভোট কাটার অঙ্ক হিসেবে দেখলে ভুল হতে পারে।

কারণ একাধিক ওয়ার্ডে নির্দল প্রার্থীরা নিজেদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় পরিচিতি এবং নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা সামনে রেখে ভোট চেয়েছেন। কোথাও তাঁরা জিতেছেন, কোথাও অল্পের জন্য হেরেছেন। আবার কোথাও তাঁদের উপস্থিতি বিজেপি-বিরোধী ভোটকে ভাগ করেছে।ফলে নির্দল ভোটের এই অঙ্ক আগামী দিনের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজ তাঁরা বিচ্ছিন্ন।

কিন্তু এই ভোট যদি কোনওদিন সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়, তাহলে শিলচরের রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই বদলে যেতে পারে। বিজেপির জন্যও কি এই ফলাফল সতর্কবার্তা? নিশ্চয়ই। বোর্ড বিজেপির দখলে। আসনের হিসাবে জয় স্পষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে এটি বড় সাফল্য। কিন্তু মোট ভোটারের হিসাবে বিজেপির সমর্থন ৩৪.৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার বিজেপিকে ভোট দেননি।

এই অঙ্ককে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ আজ বিজেপির সামনে কংগ্রেস দুর্বল। বিরোধী ভোট একাধিক প্রার্থীর মধ্যে বিভক্ত। নির্দলরা আলাদা আলাদাভাবে লড়ছেন। ফলে বিজেপির জন্য নির্বাচনী প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হয়েছে। কিন্তু আগামী দিনে যদি এই ভোট একত্রিত হয়? যদি কংগ্রেসের জায়গায় একটি গ্রহণযোগ্য বিরোধী শক্তি উঠে আসে? যদি নির্দলদের একটি অংশ সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়? তাহলে আজকের ৩৪.৬৫ শতাংশ ভোটের অঙ্কই আগামী দিনে বিজেপির জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। তবে এখানেই শেষ নয়।

বিজেপির ভোটের অঙ্ক বিশ্লেষণ করতে গেলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। এই নির্বাচনে নির্দল প্রার্থীদের সম্মিলিত ভোট প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে লড়েছেন, আবার কারও রাজনৈতিক অতীত বা কোনও দলের সঙ্গে পূর্বের যোগসূত্রও থাকতে পারে। ফলে নির্দলদের পুরো ভোটকে বিজেপি-বিরোধী ভোট বলা যেমন ঠিক হবে না, তেমনই পুরো ভোটকে বিজেপির সম্ভাব্য ভোট হিসেবেও ধরে নেওয়া যায় না।

তবে যদি নির্দল প্রার্থীদের ভোটের একটি অংশ দলীয় অসন্তোষ, ব্যক্তিগত প্রভাব বা দলীয় প্রার্থী না পাওয়ার কারণে বিজেপি থেকে সরে যাওয়া ভোট হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভোটের একটি অংশ বিজেপির সঙ্গে থাকলে তাদের মোট ভোটের হার নিঃসন্দেহে আরও বাড়ত। অর্থাৎ বর্তমান ৩৪.৬৫ শতাংশ ভোটের অঙ্কটি বিজেপির সম্ভাব্য সর্বোচ্চ জনসমর্থনের ছবি নয়, আবার নির্দলদের পুরো ভোট বিজেপির ভোট ছিল, এমন দাবিও করার সুযোগ নেই।

আর এখানেই দ্বিতীয় একটি বড় প্রশ্ন। প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার ভোটই দেননি। ৪০টি ওয়ার্ডে ভোটদানের হার ছিল ৭০.২২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ২৯.৭৮ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি। এই অনুপস্থিত ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান কী ছিল, তা নির্বাচনের ফলাফল থেকে জানা যায় না। তাঁদের মধ্যে বিজেপির সমর্থক যেমন থাকতে পারেন, তেমনই কংগ্রেস বা নির্দল সমর্থকও থাকতে পারেন। এমনকি দলীয় রাজনীতিতে অনাগ্রহী বা কোনও প্রার্থীকেই পছন্দ না করা ভোটারও থাকতে পারেন।

তাই ভোট না দেওয়া প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষকে সরাসরি বিজেপি-বিরোধী বলে ধরে নেওয়া যাবে না। কিন্তু এই দুই অঙ্ক পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। একদিকে প্রায় ১২-১৩ শতাংশ ভোট নির্দল প্রার্থীদের ঝুলিতে। অন্যদিকে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার ভোটকেন্দ্রেই যাননি। ফলে বিজেপির ৩৪.৬৫ শতাংশ ভোটকে পুরো শহরের রাজনৈতিক সমর্থনের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বরং নির্বাচনের ফলাফল একটি বিভক্ত রাজনৈতিক জনমতের ছবি সামনে আনে। বিজেপি সর্বাধিক আসন জিতেছে এবং ৪২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩২টি আসন পেয়েছে; তাদের জোটসঙ্গী অগপ পেয়েছে আরও দুটি। কংগ্রেসের আসন মাত্র দুটি, আর নির্দলরা জিতেছেন ছয়টি ওয়ার্ডে। অর্থাৎ আসনের অঙ্কে বিজেপির আধিপত্য স্পষ্ট। কিন্তু ভোটের অঙ্কে ছবিটি অনেক বেশি জটিল।

বিজেপি জিতেছে, কিন্তু শহর কি বিজেপির? এই প্রশ্নটির উত্তরও নির্বাচনের ভোটের অঙ্কেই রয়েছে। বোর্ড বিজেপির। কিন্তু শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বিজেপির নয়। এই দুই সত্যকে পাশাপাশি রেখেই শিলচর পুরনিগমের ফলাফলকে দেখতে হবে। বিজেপি নির্বাচনে জিতেছে কারণ তারা অন্যদের তুলনায় বেশি আসন জিতেছে। কিন্তু সেই জয়কে শহরের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিজেপির প্রতি সমর্থনের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বরং ফলাফল বলছে, বিজেপির সংগঠন শক্তিশালী, কংগ্রেস দুর্বল এবং বিরোধী ভোট বিভক্ত। এই তিনটি কারণ একসঙ্গে বিজেপির পক্ষে ফল তৈরি করেছে। আগামী দিনের আসল লড়াই এখন শুরু প্রথম পুরনিগম নির্বাচন শেষ। বোর্ড গঠন করবে বিজেপি। এখন আর ভোট চাওয়ার সময় নয়, কাজ দেখানোর সময়। কারণ নির্বাচনের পর ভোটের অঙ্ক বদলে যায়। ক্ষমতায় থাকা দলের সামনে তখন নতুন পরীক্ষা শুরু হয়।

রাস্তা, নিকাশি, পানীয় জল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আলো, নাগরিক পরিষেবা, কর এবং শহরের পরিকাঠামো নিয়ে বোর্ড কতটা কাজ করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে বিজেপির আগামী দিনের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। আজ যে ভোট বিভাজন বিজেপিকে জয়ের পথ দেখিয়েছে, আগামী দিনে সেই বিভাজন থাকবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। কংগ্রেসের সামনে তাই আত্মসমালোচনার সময়।

নির্দলদের সামনে সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা। আর বিজেপির সামনে ক্ষমতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। প্রথম পুরনিগম নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একটাই, আসন জেতা আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আস্থা অর্জন করা এক কথা নয়। শিলচরের রাজনৈতিক ময়দানে বিজেপির হাতে আজ বোর্ড। কিন্তু আগামী দিনের লড়াই হবে আরও কঠিন একটি প্রশ্নকে ঘিরে, যে শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট বিজেপির পক্ষে যায়নি, সেই শহরের আস্থা বিজেপি কতটা ধরে রাখতে পারে?

Related Posts

অহংকার, টিকিট-বাণিজ্য আর স্বজনপোষণের মাশুল!

নিজ গড়ে সজল আচার্যের বধ, শিলচরে কংগ্রেসের ‘রাজনৈতিক সলিল সমাধি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১০ অক্টোবরঃ কাছাড় জেলা কংগ্রেস সভাপতি সজল আচার্য এখন মুখ লুকাবেন কোথায়? নাকি আগের মতোই আবার বুক…

ভুয়ো ডিগ্রির মুকুট পরে শিলচর পুরনিগমের মসনদে!

সার্টিফিকেট জালিয়াতির রমরমা বাজারে শিলচরের সচেতন ভোটারদের মুকুটে যুক্ত হলো লজ্জার নতুন পালক ড. নিখিল দাশ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১০ অক্টোবরঃ ভাষার জন্য রক্তদান ও সংস্কৃতির উর্বর ভূমি, পন্ডিত-মনীষীদের জন্মস্থান…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *