বিল হচ্ছে রামনগরের নামে, চাল আসছে বদরপুর এফসিআই থেকে! গাড়িপ্রতি ২,৩০০ টাকার ভুয়া বিল বানিয়ে পকেটস্থ!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ অক্টোবরঃ সরকারি সমবায় ব্যবস্থায় কি শেষপর্যন্ত দুর্নীতির ঘুণ ধরেছে? কালাইন কো-অপারেটিভ সোসাইটিকে কেন্দ্র করে ফের সামনে এল এক মারাত্মক ও অমার্জনীয় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। সরকারি চাল পরিবহণের টেন্ডার, বাস্তব পরিবহণের দূরত্ব এবং ভুয়ো গাড়িভাড়ার হিসাব মিলিয়ে সরকারি তহবিলের লক্ষ লক্ষ টাকা নয়ছয়ের যে চাঞ্চল্যকর খেলা শুরু হয়েছে, তাতে এখন তোলপাড় গোটা এলাকা।
অভিযোগের তীর সরাসরি সমবায় চত্বরের বিভাগীয় আধিকারিক এবং সোসাইটির সেক্রেটারির যোগসাজশের দিকে। স্থানীয় সচেতন নাগরিক এবং ভুক্তভোগীদের দাবি, লুটপাটের এই নিখুঁত ছক নিছক কোনো ভুল নয়, বরং পদাধিকারীদের পকেট ভরানোর এক সুপরিকল্পিত দুর্নীতি!

১৪ কিমির বদলে ৪৪ কিমির ভাড়া! কালাইন কো-অপারেটিভে মহা-জালিয়াতির পর্দাফাঁস!
অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহণের দূরত্বের হিসাব। নথিপত্রে কালাইন থেকে রামনগর এফসিআই গুদামের দূরত্ব ধরা হয়েছে প্রায় ৪৪ কিলোমিটার। এই ৪৪ কিলোমিটার দূরত্বের সরকারি অনুমোদিত ভাড়ার হার অনুযায়ী প্রতি ট্রিপে এক-একটি গাড়ির জন্য বরাদ্দ প্রায় ৫,২০০ টাকা। সেই মর্মে টেন্ডারও পাশ করানো হয়। কিন্তু বাস্তবে যে খেলাটি খেলা হচ্ছে, তা শুনে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়!
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কালাইনের জন্য চাল বাস্তবে রামনগর থেকে তোলাই হচ্ছে না; আনা হচ্ছে কালাইন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বদরপুর এফসিআই গুদাম থেকে! ১৪ কিলোমিটারের সরকারি নিয়ম অনুযায়ী গাড়িপ্রতি প্রকৃত ভাড়া হওয়ার কথা প্রায় ২,৯০০ টাকা।
বিভাগীয় আধিকারিক ও সেক্রেটারির যোগসাজশে সরকারি ফান্ডের হরিলুটের অভিযোগ
অর্থাৎ, বদরপুর থেকে চাল এনে তা রামনগর থেকে আনার নথিপত্র দেখিয়ে প্রতি ট্রিপে সোজা ২,৩০০ টাকা করে পকেটস্থ করা হচ্ছে! এক-একটি গাড়িতে যদি ২,৩০০ টাকা করে অতিরিক্ত ভাড়া বা বিল বানানো হয়, তবে কয়েক হাজার ট্রিপে এই অর্থ তছরুপের পরিমাণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা ভেবেই শিউরে উঠছেন এলাকার মানুষ।
এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগীদের বিস্ফোরক অভিযোগ, এ কাজ বিভাগীয় আধিকারিক ও সেক্রেটারির প্রত্যক্ষ মদত ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। টেন্ডারে রামনগরের নাম থাকা সত্ত্বেও বদরপুর থেকে চাল তোলার সরকারি লিখিত অনুমতিপত্র আছে কি? যদি না থাকে, তবে কার নির্দেশে বদরপুর থেকে চাল তোলা হচ্ছে এবং কেন বিল জমা দেওয়া হচ্ছে রামনগরের ৪৪ কিলোমিটারের দূরত্বের ভিত্তিতে?

সাধারণ মানুষের সোজাসাপটা প্রশ্ন, গাড়ির চালান, এফসিআই-এর গেট পাস, লোডিং স্লিপ এবং প্রকৃত যাত্রাপথের অসংগতি কি বিল পাশ করানোর দায়িত্বে থাকা বিভাগীয় আধিকারিকদের চোখে পড়েনি? নাকি জেনেশুনেই মোটা অঙ্কের কাটমানির বিনিময়ে চোখ বুজে ভুয়ো বিলে সই করে সরকারি খাজনা খালি করার বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন তাঁরা?
সরকারি খাদ্য সুরক্ষা আইনে প্রতিটি খাদ্যশস্য চালানের গেট পাস, চালের মোট ওজন, গাড়ির নম্বর এবং চালানের তারিখের সঙ্গে রুট ম্যাপ মিলিয়ে সরকারি বিল জমা দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। কালাইন কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে যদি এই ভুয়ো দূরত্ব দেখিয়ে সরকারি খাতের অর্থ তুলে নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা পরিষ্কারভাবে সরকারি তহবিল তছরুপ এবং ফৌজদারি অপরাধের সামিল।
নথিপত্র খতিয়ে দেখেতে নিরপেক্ষ ভিজিল্যান্স তদন্তের জোর দাবিতে সোচ্চার স্থানীয়রা
অভিযোগ উঠেছে, ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দের চাল নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার পেছনে সমবায়ের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। কম খরচে পরিবহণ সেরে বেশি খরচের সরকারি ভাউচার বানিয়ে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ টাকা নিজেদের ও অনুগামীদের পকেটে ঢোকানোই এদের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সচেতন মহল ও স্থানীয় বাসিন্দারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নিছক মুখে কোনো সাফাই বা অভ্যন্তরীণ ফাঁকা রিপোর্ট দিয়ে এই দুর্নীতির পাহাড় ঢাকা দেওয়া যাবে না। তাঁরা অবিলম্বে প্রশাসন ও সমবায় বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি তুলেছেন, টেন্ডারের মূল নথি এবং সংশোধিত রুট পারমিটের সত্যতা প্রকাশ করতে হবে।
চাল পরিবহণকারী প্রতিটি গাড়ির প্রকৃত নম্বর, গেট পাস এবং লোডিং স্লিপ যাচাই করতে হবে। প্রতিটি ট্রিপের ভাউচার ও ব্যাঙ্কের অর্থ পরিশোধের বিবরণ জনসমক্ষে আনতে হবে। অনিয়মে জড়িত থাকা বিভাগীয় আধিকারিক এবং সেক্রেটারির বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক বিভাগীয় তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারি অর্থের প্রতিটি পয়সা সাধারণ করদাতার রক্তজল করা উপার্জনের টাকা। দুর্নীতির এই পাহাড়ের পেছনে কার কার হাত রয়েছে, প্রশাসন কি তা খুঁজে বের করতে নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেবে? নাকি আইনি ফাঁকফোকর ও নথিপত্রের আড়ালেই ঢাকা পড়ে যাবে কালাইন কো-অপারেটিভের এই মেগা দুর্নীতি? এখন দেখার, অভিযোগের তির যাঁদের দিকে, সেই বিভাগীয় আধিকারিক ও সেক্রেটারির বিরুদ্ধে কতটা দ্রুত ও কড়া পদক্ষেপ নেয় সংশ্লিষ্ট উচ্চতর প্রশাসন।




