রক্ষকই নাকি ভক্ষক! সীমান্তে চরম দুর্দশা, তার ওপর পুলিশের তোলাবাজি

আহার, পানীয় জল ও মাথার ওপর ছাদহীন অবস্থায় যখন দূরদূরান্ত থেকে আসা চালক ও সহকারীদের দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়, ঠিক তখনই উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে সেই অসহায়তাকে পুঁজি করার এক কুৎসিত অভিযোগ উঠে এলো কাছাড় জেলার বাশকান্দি পুলিশ ফাঁড়ির একাংশের বিরুদ্ধে!

সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়ার ভুয়ো আশ্বাস দিয়ে ট্রাকচালকদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী ট্রাকচালকেরা। ঘটনাটি কেন্দ্র করে জাতীয় সড়ক জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের আগুন জ্বলছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও অসহায় চালকদের সরাসরি অভিযোগ, গত ১৬ আগস্ট গভীর রাতে যখন বাশকান্দি উজান তারাপুর এলাকায় জাতীয় সড়কের ওপর ট্রাকগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখনই বাশকান্দি পুলিশ ফাঁড়ির কিছু সদস্য তাঁদের কাছে পৌঁছান। দীর্ঘদিনের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় প্রহর গোনা চালকদের প্রলোভন দেখানো হয়, টাকা দিলেই অলৌকিক কৌশলে মিলবে মণিপুরে প্রবেশের ‘গ্রিন সিগন্যাল’।

চালকদের দাবি, দ্রুত সীমান্ত পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়নায় এবং পুলিশের অভয় পেয়ে তাঁরা বিশ্বাস করতে বাধ্য হন। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি ট্রাক থেকে নগদ ২,০০০ টাকা করে জোরপূর্বক বা কৌশল খাটিয়ে আদায় করা হয়। সে রাতে বাশকান্দির ওই নির্দিষ্ট এলাকাতেই প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি পণ্যবাহী ট্রাকের কাছ থেকে এভাবে দেদার টাকা আদায় করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগী চালক সমাজ দাবি করেছেন। অর্থাৎ, এক রাতেই চালকদের পকেট থেকে লাখ টাকার কাছাকাছ হাতিয়ে নেওয়ার এক চরম নকশা বাস্তবায়িত হয়।

পুলিশের আশ্বাসে ভরসা রেখে এবং পকেটের শেষ সম্বলটুকু তুলে দিয়ে চালকেরা যখন আশায় বুক বেঁধে মণিপুর সীমান্তের দিকে রওয়ানা হন, ঠিক তখনই ঘটে আসল বিপত্তি। ট্রাকগুলো জিরিঘাট সীমান্তে পৌঁছানো মাত্রই সেখানকার সীমান্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীরা সেগুলোকে বরাবরের মতো আটকে দেন।

সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, ওপরতলার কড়া নির্দেশ ছাড়া কোনো গাড়িকেই মণিপুর সীমান্তে প্রবেশ করতে দেওয়া সম্ভব নয়। তখনই চক্ষু চড়কগাছ হয় অসহায় চালকদের! তাঁরা বুঝতে পারেন, বাশকান্দি পুলিশের একাংশের ফাঁদে পা দিয়ে তাঁরা স্রেফ প্রতারিত হয়েছেন। না মিলল পারাপারের অনুমতি, আর না ফেরত পাওয়া গেল কষ্টের সেই টাকা।

প্রতারণার শিকার হয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন ভুক্তভোগী ট্রাকচালকেরা। জিরিঘাট ও বাশকান্দি সীমান্তে সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা পুলিশের এই বেপরোয়া ও অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। চালকদের ক্ষুব্ধ প্রশ্ন, এমনিতেই এক মাস ধরে কাজ বন্ধ, পকেটে টাকা নেই, তার ওপর পুলিশের পোশাক পরে এভাবে দিনদুপুরে তোলাবাজি করা হচ্ছে কীভাবে? আইনরক্ষক যদি নিজেই ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

ট্রাক মালিক ও চালক অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে পুরো বিষয়ের ওপর কাছাড় জেলার পুলিশ সুপার এবং রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কড়া হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে। অভিযোগের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জানিয়ে চালকেরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের অবিলম্বে বরখাস্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে।

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় সড়কে ট্রাক আটকে থাকার কারণে খাবার ও ওষুধের সংকটে ভুগছেন চালকেরা। এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশ এমন আর্থিক অপরাধে লিপ্ত হয়, তবে তা প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট চপেটাঘাত। তবে চালকদের তোলা এই গুরুতর অভিযোগের সত্যতা এখনও পর্যন্ত কোনো স্বাধীন সংস্থা দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনার পর থেকে বাশকান্দি পুলিশ ফাঁড়ি বা কাছাড় জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো সরকারি বা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিক মহল থেকে জানানো হয়েছে, নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়ার পরেই স্পষ্ট হবে, এর পেছনে পুলিশকর্মীদের নাম ভাঙিয়ে কোনো দালাল চক্র কাজ করছিল, নাকি সত্যিই খোদ রক্ষকেরাই জড়িয়ে পড়েছেন এই ন্যক্কারজনক তোলাবাজিতে।

Related Posts

দুই বছরের নীরবতার পর পিএম কেয়ার্সের হিসাব প্রকাশ, ৮,৪৫২ কোটি টাকা তহবিলে পড়ে রয়েছে

এক বছরে খরচ মাত্র ৮৭ লক্ষ, অনুদান ও সুদে আয় ১,২০০ কোটির বেশি, স্বচ্ছতা নিয়ে সোচ্চার বিরোধীরা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ দুই বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে পিএম কেয়ার্স…

জনগণনার আগেই এনআরসি-র দাবিতে উত্তাল মণিপুর, দু’দিনের ধর্মঘটে ছাত্র সংগঠন

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত জনগণনা বন্ধের দাবি, ১৯৫১-কে ভিত্তিবর্ষ করার প্রস্তাব, বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে হিংসা ও অস্থিরতার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *