রাজ্যের ৫৯টির মধ্যে ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের শাখা পরিচালনা হবে বরাক সচিবালয় থেকেই
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দাবি এবং সরকারি পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যাশার মধ্যে বরাক উপত্যকার জন্য বড় ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পথে এগোল অসম সরকার। রাজ্য মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক বৈঠকে বরাক উপত্যকায় থাকা ‘মিনি সচিবালয়’এর নাম পরিবর্তন করে ‘অসম সচিবালয়, বরাক উপত্যকা’করার প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারের ৫৯টি বিভাগের মধ্যে ৩২টি বিভাগের কাজকর্ম এই শাখা থেকে পরিচালনার জন্য নীতিনির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্তকে নিছক নাম পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না প্রশাসনিক মহলের একাংশ। কারণ, নামের পরিবর্তনের পাশাপাশি যদি সত্যিই ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কাজ বরাক উপত্যকা থেকে নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য বিকেন্দ্রীকরণমূলক পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
এতদিন বরাক উপত্যকার বিভিন্ন জেলার মানুষকে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজের জন্য গুয়াহাটির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। সরকারি দফতরের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন প্রকল্পের অনুমোদন, প্রশাসনিক বৈঠক কিংবা নীতিগত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই উপত্যকার মানুষের কাছে গুয়াহাটি ছিল প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র।
ফলে ভৌগোলিক দূরত্বের পাশাপাশি সময়, অর্থ এবং প্রশাসনিক জটিলতাও অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সমস্যা বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘অসম সচিবালয়, বরাক উপত্যকা’নামকরণের সিদ্ধান্ত নতুন তাৎপর্য বহন করছে। শুধু নাম বদল নয়, বদল আসবে প্রশাসনিক কাজের ধরনেও?
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাজ্যের ৫৯টি বিভাগের মধ্যে ৩২টি বিভাগের কাজকর্ম বরাক উপত্যকার সচিবালয় শাখা থেকে পরিচালনার জন্য নীতিনির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু একটি ভবনের নাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রশাসনিক ক্ষমতা ও কাজের পরিধি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ যদি নিয়মিতভাবে বরাক থেকেই সম্পন্ন করা যায়, তাহলে স্থানীয় মানুষকে প্রতিটি বিষয়ে গুয়াহাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি আধিকারিকদের উপস্থিতি এবং বিভাগীয় কাজের পরিধি বাড়লে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে দ্রুত হতে পারে।

বিশেষ করে বরাক উপত্যকার তিন জেলা কাছাড়, হাইলাকান্দি ও শ্রীভুমি সহ বিস্তৃত অঞ্চলের মানুষের জন্য এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি পরিষেবা, উন্নয়নমূলক প্রকল্প, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কেন্দ্র তৈরি হতে পারে। বরাক উপত্যকার অন্যতম দীর্ঘদিনের অভিযোগ হল প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গুয়াহাটিনির্ভরতা। রাজ্যের রাজধানী থেকে ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে অবস্থান করার কারণে বরাকের বাসিন্দাদের বহু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাজের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করতে গুয়াহাটি যাওয়া অনেকের কাছেই সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ব্যবসায়ী, সাধারণ নাগরিক, বিভিন্ন সংগঠন, জনপ্রতিনিধি কিংবা উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্যও এই দূরত্ব কখনও কখনও বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ৩২টি বিভাগের কাজ বরাক উপত্যকা থেকে পরিচালনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে এই পরিবর্তনের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কতটা ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এই আঞ্চলিক সচিবালয়কে দেওয়া হয় তার ওপর।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই বরাক উপত্যকার মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলের মানুষ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উন্নয়নমূলক প্রকল্পে দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সরকারি পরিষেবার সহজলভ্যতার দাবি জানিয়ে আসছেন। নতুন নামের সঙ্গে যদি বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষমতাও যুক্ত হয়, তাহলে বরাক উপত্যকার সরকারি প্রশাসনের চরিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকদের নিয়মিত উপস্থিতি, বিভাগীয় বৈঠক, ফাইল নিষ্পত্তি এবং সরকারি প্রকল্পের তদারকি স্থানীয়ভাবে করা সম্ভব হলে উন্নয়নমূলক কাজের গতি বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
তবে শুধু পরিকাঠামো বা নাম পরিবর্তন করলেই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ সম্পূর্ণ হবে না। বরং কোন ৩২টি বিভাগের কী ধরনের ক্ষমতা থাকবে, কোন সিদ্ধান্তগুলি বরাক থেকে নেওয়া যাবে, কোন পর্যায়ের আধিকারিক এখানে থাকবেন এবং গুয়াহাটির সচিবালয়ের সঙ্গে সমন্বয় কীভাবে হবে—এই বিষয়গুলিই শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটির সাফল্য নির্ধারণ করবে। বরাক উপত্যকার প্রধান শহর শিলচর দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও যদি সচিবালয়ের কাজের পরিধি বাড়ানো হয়, তাহলে শিলচরের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সরকারি দফতরকেন্দ্রিক পরিষেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে। বিভিন্ন বিভাগের আধিকারিক, কর্মী ও সংশ্লিষ্ট পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলির উপস্থিতি বাড়লে শহর ও আশপাশের এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বরাক উপত্যকার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ সব প্রশাসনিক কাজ যদি কেবল রাজ্যের রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে আঞ্চলিক পর্যায়ে পরিচালিত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ঘোষণা।
কিন্তু এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। ৩২টি বিভাগের কাজ কীভাবে বরাক থেকে পরিচালিত হবে, কতগুলি দফতর কার্যত এখানে স্থানান্তরিত হবে, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ক্ষমতা কতটা থাকবে এবং সাধারণ মানুষ সরাসরি কী কী পরিষেবা পাবেন, এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।
বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে তাই এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন আশার আলো, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে বাস্তবায়নের অপেক্ষা। ‘মিনি সচিবালয়’এর নাম বদলে ‘অসম সচিবালয়, বরাক উপত্যকা’করা যদি কেবল সাইনবোর্ড পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণে রূপ নেয়, তাহলে এটি বরাকের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মোড় হয়ে উঠতে পারে। এখন নজর থাকবে নীতিনির্দেশিকা কার্যকর হওয়ার পর ৩২টি বিভাগের কতটা কাজ বাস্তবে বরাক থেকে পরিচালিত হয় এবং সাধারণ মানুষ তার সুফল কত দ্রুত পান। নামের পরিবর্তনের পর এবার বরাকবাসীর অপেক্ষা প্রশাসনিক ক্ষমতার বাস্তব পরিবর্তনের।






