বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১৪ মেঃ শ্রীভুমিজেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল আজ যেন ধুঁকতে থাকা এক ভাঙাচোরা চরম বেহাল দশা। বাইরে থেকে বিশাল ভবন, সরকারি উন্নয়নের নানা দাবি, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে চরম অব্যবস্থা, অবহেলা এবং রোগীদের সীমাহীন দুর্ভোগের করুণ চিত্র। চিকিৎসা নিতে এসে মানুষ যেন নতুন করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আর এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র সরেজমিনে দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন উত্তর করিমগঞ্জের নবনির্বাচিত বিধায়ক জাকারিয়া আহমদ (পান্না)।
বুধবার সকালে বিধায়ক হঠাৎ করেই করিমগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে পৌঁছে বিভিন্ন ওয়ার্ড, আইসিইউ, প্রসূতি বিভাগ, পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা, শৌচালয়, লিফ্ট, রোগীদের খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা এবং হাসপাতালের ফার্মেসি ঘুরে দেখেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জেলা কংগ্রেস সভাপতি তাপস পুরকায়স্থ, শহর ব্লক কংগ্রেস সভাপতি অনুরাগ দত্ত, তন্ময় মজুমদার, আব্দুল হালিম তাপাদার সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বিকল লিফ্ট, নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ, অচল ফ্যান ও পানীয় জল সংকট, রোগীদের আর্তনাদে সরব জাকারিয়া আহমদ
পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের একের পর এক সমস্যার পাহাড় সামনে আসে। কোথাও রোগীরা গরমে হাঁসফাঁস করছেন, কোথাও শৌচালয়ের নোংরা পরিবেশে অসহনীয় দুর্গন্ধ, আবার কোথাও রোগীর আত্মীয়দের মেঝেতে রাত কাটাতে দেখা যায়। বহু রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বিধায়কের সামনে ক্ষোভ উগরে দেন। এক বৃদ্ধ রোগীর ছেলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ আসে বাঁচার আশায়। কিন্তু এখানে এসে ওষুধ নেই, পরীক্ষা বাইরে করতে হয়, লিফ্ট চলে না।

রোগীকে কোলে করে তিনতলায় তুলতে হচ্ছে। এটা হাসপাতাল না যন্ত্রণার ঘর? অভিযোগের পাহাড় সবচেয়ে বেশি জমেছে হাসপাতালের ফার্মেসিকে ঘিরে। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে লেখা অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধই হাসপাতালে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলিকে বাইরে থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে। অনেকেই দাবি করেন, সরকার বলে সব ফ্রি, কিন্তু বাস্তবে একটা স্যালাইন থেকে শুরু করে ইনজেকশন পর্যন্ত বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষুব্ধ উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক, দ্রুত সংস্কারের নির্দেশ
বিশেষভাবে সক্ষম রোগী, বৃদ্ধ এবং দুর্ঘটনায় আহতদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে হাসপাতালের লিফ্ট দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকায়। একাধিক রোগীর স্বজন জানান, স্ট্রেচার ঠেলে বা কাঁধে তুলে রোগীদের উপরের তলায় নিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রোগীরা যন্ত্রণা পাচ্ছেন, অন্যদিকে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। বিধায়ক পরিদর্শনের সময় দেখেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত হুইলচেয়ারও নেই। অনেক রোগীকে আত্মীয়দের কাঁধে ভর দিয়ে বা টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে।
এছাড়া বিভিন্ন ওয়ার্ডে সিলিং ফ্যান বিকল হয়ে থাকায় গরমে রোগীদের নাজেহাল অবস্থা। শিশু ও বৃদ্ধ রোগীদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ বলে জানান তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। আরও উদ্বেগজনক বিষয় সামনে আসে হাসপাতালের ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে। তৃতীয় তলার একটি অংশে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে বলেও অভিযোগ ওঠে। এই পরিস্থিতিতে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, “বড় দুর্ঘটনা না ঘটলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে না।
পানীয় জলের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। হাসপাতালের বেশ কয়েকটি ওয়াটার মেশিন দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। ফলে রোগীর পরিবারের সদস্যদের বাইরে থেকে বোতলজাত পানি কিনতে হচ্ছে। শৌচালয়ের অবস্থাও নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর বলে অভিযোগ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকে।
পরিদর্শন শেষে ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম স্বাস্থ্য সঞ্চালক ডা. বি. কে. সরকার এবং হাসপাতাল সুপার ডা. শুভ্রাংশু ভট্টাচার্যের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন বিধায়ক জাকারিয়া আহমদ। বৈঠকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, রোগীদের জীবন নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা বরদাস্ত করা হবে না। হাসপাতালের প্রতিটি সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বিধায়ক বলেন, করিমগঞ্জ জেলার মানুষের জন্য এই হাসপাতালই শেষ ভরসা। অথচ এখানে যে চিত্র দেখলাম, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ওষুধ নেই, লিফ্ট নেই, পানীয় জল নেই, ফ্যান চলে না, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমি বিষয়গুলি রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের নজরে আনব। দ্রুত সংস্কার না হলে বৃহত্তর আন্দোলন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, স্বাস্থ্যখাতে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও সাধারণ মানুষ কেন ন্যূনতম পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন? হাসপাতালের পরিকাঠামো সংস্কার ও পরিষেবা উন্নয়নের নামে বরাদ্দ হওয়া অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। করিমগঞ্জের সাধারণ মানুষের মতে, বহুদিন ধরেই হাসপাতালের নানা সমস্যা নিয়ে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ফলে মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছিল। নবনির্বাচিত বিধায়কের এই আকস্মিক পরিদর্শন অন্তত সমস্যাগুলি নতুন করে আলোচনায় এনে প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করবে বলেই মনে করছেন অনেকে। তবে প্রশ্ন একটাই, এই পরিদর্শন ও আশ্বাস কি বাস্তব পরিবর্তন আনবে, নাকি সবকিছু আবারও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এখন সেই উত্তরই খুঁজছে করিমগঞ্জের অসহায় রোগী ও তাঁদের পরিবার।





