বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ আগষ্টঃ উজান অসমের বন্যাকবলিত এলাকাগুলিতে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ত্রাণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল অসম সরকার। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা অনলাইনে প্রকাশ করা হবে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি ঘরে বসেই সরকারি তালিকায় তাদের নাম ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে পারবেন।
সোমবার লোকসেবা ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানান, অসম রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট ওয়েব পোর্টালে প্রথম পর্যায়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের তালিকা প্রকাশ করা হবে। তালিকা প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আপত্তি ও অভিযোগ গ্রহণ করা হবে। কারও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ বাদ পড়লে বা কোনও তথ্য ভুল থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এবারের ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৪৮০ কোটি টাকার সম্পত্তি ও পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একইসঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ২৬,৬৮১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিতে রাজ্য সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে বলেও জানান তিনি। হিমন্ত বলেন, বন্যার ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণ বণ্টনে এই ধরনের স্বচ্ছ পদ্ধতি আগে রাজ্যে কার্যকর করা হয়নি। জনগণের আস্থা ও সন্তুষ্টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
অভিযোগ ও বাদ পড়া পরিবারের বিষয়গুলি যাচাই করতে আগামী ১ অথবা ২ সেপ্টেম্বর থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ের সমীক্ষা শুরু হবে। এই পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সরকারি দফতরে ছুটতে হবে না। সমীক্ষক দল সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে গিয়ে পুনরায় তথ্য যাচাই করবে। দ্বিতীয় পর্যায়ের সমীক্ষা ১০ অথবা ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা আগামী ১৫ অথবা ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রকাশ করা হতে পারে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরও যদি আপত্তি বা অভিযোগ থাকে, তাহলে তৃতীয় দফায় ক্ষয়ক্ষতির সমীক্ষা করা হবে। দুর্গাপূজার আগেই, অর্থাৎ ৯ বা ১০ অক্টোবরের মধ্যে অথবা সম্ভব হলে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সরাসরি উপভোক্তার ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজে বর্তমানে ১,১৪৪ জন সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষককে নিযুক্ত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৬,৬৮১টি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি, ১৮,৮৮৭টি ক্ষতিগ্রস্ত গোয়ালঘর, ৪১ হাজারের বেশি তাঁতের কাঁচামালের ক্ষয়ক্ষতি এবং ৫,৯৮,৬৯১টি গবাদি পশুর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত নিরূপিত সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা। তবে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই হিসাব এখনও ক্ষতিগ্রস্ত জনসংখ্যার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে।
ফলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কৃষি ও মৎস্যক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও একই সঙ্গে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৯৯,২৫৬ জন কৃষককে শনাক্ত করা হয়েছে, যাঁদের চাষের জমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রথম পর্যায়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ আগামী ২৮ অথবা ২৯ আগস্টের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
সোমবার চরাইদেও, শিবসাগর, যোরহাট ও গোলাঘাট জেলার ৩১,৯৯১টি পরিবারকে অন্তর্বর্তীকালীন বন্যা সহায়তা হিসেবে মোট ৪৭.৯৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে চারটি বন্যাকবলিত জেলায় ৯৬,৮৪২টি পরিবারকে একই হারে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত রাজ্য সরকার ১৪৬.২৬ কোটি টাকা অন্তর্বর্তীকালীন বন্যা সহায়তা হিসেবে বিতরণ করেছে।
শিবসাগর বিধানসভা এলাকার আরও প্রায় ৩,০০০ পরিবার বর্তমানে যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। তাঁরা যোগ্য বলে বিবেচিত হলে তৃতীয় পর্যায়ের অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তার আওতায় আনা হবে। সেক্ষেত্রে মোট উপভোক্তার সংখ্যা প্রায় এক লক্ষে পৌঁছতে পারে। ক্ষতিপূরণ বিতরণের পর গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শিবসাগর ও চরাইদেওর মতো জেলায় প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার মাধ্যমে দ্রুত বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে বলেও মুখ্যমন্ত্রী জানান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনার পর চরাইদেও ও শিবসাগরের যোগ্য উপভোক্তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার বাড়ি নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
রবিবার মুখ্যমন্ত্রী ওই চারটি বন্যাকবলিত জেলার ত্রাণ, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কর্মসূচি পর্যালোচনা করেন। বৈঠকে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব, অন্তর্বর্তীকালীন ত্রাণ, বিদ্যালয় ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র পুনরুদ্ধার, ব্যাংক ঋণে স্থগিতাদেশ, বিমার দাবি এবং স্বাস্থ্য ও পশুচিকিৎসা শিবিরের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, মোট ক্ষয়ক্ষতির প্রায় ৭৫ শতাংশ সমীক্ষা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করতে এক হাজারেরও বেশি সমীক্ষক মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৭৯৩টি বিদ্যালয়ের মেরামতির কাজ চলছে এবং শীঘ্রই সেগুলিতে পুনরায় পঠনপাঠন শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি রাস্তা ও অন্যান্য সরকারি পরিকাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলছে। শিবসাগরের নিচু এলাকাগুলির জল নিষ্কাশনের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প দিনরাত চালানো হচ্ছে। স্বাস্থ্য শিবিরের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বন্যা-পরবর্তী রোগের প্রাদুর্ভাবের উপরও নজর রাখা হচ্ছে। ব্যাংক ঋণে ছাড় এবং বিমা সংক্রান্ত দাবিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। যোগ্য উপভোক্তাদের আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে বিমার দাবি দাখিল করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ জুলাই থেকে উচ্চ অসমের শিবসাগর, চরাইদেও ও যোরহাটে অস্বাভাবিক ও আকস্মিক বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ত্রাণ, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য অসম সরকার প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ের ঘোষণা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কাজে কোনও ধরনের গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না বলেও তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।
মোট বরাদ্দ ১৪৬.২৬ কোটি টাকা: রাজ্য সরকার এখনও পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন বন্যাত্রাণ বাবদ ১৪৬.২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ৪৭.৯৩ কোটি বিতরণ : সোমবার চরাইদেও, শিবসাগর, যোরহাট ও গোলাঘাট জেলার ৩১,৯৯১টি বন্যাকবলিত পরিবারকে অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা হিসেবে ১৫ হাজার টাকা করে মোট ৪৭.৯৩ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। আগেই সহায়তা পেয়েছে ৯৬,৮৪২ পরিবার : চারটি বন্যাকবলিত জেলার ৯৬,৮৪২টি পরিবারকে ইতিমধ্যে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
আরও ৩,০০০ পরিবার যাচাইয়ের আওতায়, শিবসাগর বিধানসভা এলাকার প্রায় ৩,০০০টি পরিবার বর্তমানে যাচাই-প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। উপভোক্তার সংখ্যা এক লক্ষ হতে পারে, যাচাইয়ের পর ওই পরিবারগুলি ক্ষতিপূরণের জন্য যোগ্য বিবেচিত হলে তৃতীয় পর্যায়ের অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে মোট উপভোক্তার সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ পরিবারে পৌঁছতে পারে।





