বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা সেমিনারের মধ্য দিয়ে বরাক ভ্যালি ভলান্টারি ব্লাড ডোনার্স ফোরামের রজতজয়ন্তী বর্ষের শুভ সূচনা

প্রতিকূল আবহাওয়া, ঝুম বৃষ্টি কিংবা দুর্যোগ কোনও কিছুই যেন দমাতে পারেনি মানবিক দায়বদ্ধতায় উজ্জীবিত রক্তদাতা ও সমাজসেবীদের উদ্দীপনাকে। বুধবার সকাল থেকেই শহরে এক ভিন্ন আবহের সৃষ্টি হয়। জেলার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং যুব সংগঠনের সদস্যদের অংশগ্রহণে আয়োজিত শোভাযাত্রা মানবতার বার্তাকে নতুনভাবে তুলে ধরে।

সকালে জেলা ক্রীড়া সংস্থা (ডিএসএ)-র প্রবেশপথের সামনে থেকে শোভাযাত্রার সূচনা হয়। হাতে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, রক্তদানের সচেতনতা বার্তা এবং থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের আহ্বান নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা শহরের রাজপথে এগিয়ে চলেন। প্রবল বর্ষণের মধ্যেও অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও বৃষ্টির তীব্রতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় শোভাযাত্রা গোলদিঘি মল এলাকায় এসে সমাপ্ত করা হয়।

সেখানে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তারা রক্তদান আন্দোলনের গুরুত্ব, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা এবং যুবসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর জোর দেন। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হায়দরাবাদ থ্যালাসেমিয়া অ্যান্ড সিক্‌ল সেল সোসাইটির সভাপতি বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. চন্দ্রকান্ত আগরওয়াল।

তিনি বরাক ভ্যালি ভলান্টারি ব্লাড ডোনার্স ফোরামের গত ২৫ বছরের নিরবচ্ছিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, রক্তদান শুধুমাত্র একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি মানবতার সবচেয়ে বড় সেবা। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত রক্তদান অপরিহার্য। তিনি আরও বেশি সংখ্যক যুবক-যুবতীকে নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এছাড়াও বক্তব্য রাখেন ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. মনোজ কুমার পাল, সাধারণ সম্পাদক আশু পাল, রক্তদান আন্দোলনের সহযোগী সংস্থা ‘স্মাইল’এর কর্ণধার সুরজিত সোম, ইয়ুথ এগেন্সট সোশ্যাল এভিলস্‌ এর সভাপতি সঞ্জীব রায়, বরাক ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্ণধার প্রদীপ বণিক, নাগরিক স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য দীপঙ্কর চন্দ, ফোরামের হাইলাকান্দি জেলা কমিটির প্রতিনিধি সঞ্জীব দে, বড়থল চা শ্রমিক উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে জয়প্রকাশ তেওয়ারি এবং কাছাড় জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সব্যসাচী রুদ্রগুপ্ত প্রমুখ।

শোভাযাত্রায় অংশ নেয় শিলচর মহিলা কলেজের এনসিসি ইউনিট, অল মেডিক্যাল সেলস পিউপিল অ্যাসোসিয়েশন, এসো বলি, বিভিন্ন লিও ও লায়ন্স ক্লাব, রোটারি ক্লাব, মর্নিং ক্লাব-সহ একাধিক সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সব মিলিয়ে শহরের রাজপথে এদিন মানবতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য চিত্র ধরা পড়ে। অনুষ্ঠানের শেষে ধন্যবাদজ্ঞাপন করেন ফোরামের কাছাড় জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সব্যসাচী রুদ্রগুপ্ত।

এদিকে বিকেল ৩টায় রাজীব ভবনের দ্বিতীয় তলার কনফারেন্স হলে আয়োজিত হয় থ্যালাসেমিয়া রোগ বিষয়ক এক সচেতনতামূলক সেমিনার। চিকিৎসক, সমাজকর্মী, রক্তদাতা, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগী এবং তাদের অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সেমিনারটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। নির্ধারিত বক্তা ডা. চন্দ্রকান্ত আগরওয়াল সকালে শোভাযাত্রায় অংশ নিলেও অনিবার্য শারীরিক ও পারিবারিক কারণে তাঁকে দুপুরের বিমানে হায়দরাবাদ ফিরে যেতে হয়।

তবে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সেমিনারে মূল আলোচনা করেন বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিতাংশু দাম। ফোরামের কাছাড় জেলা কমিটির সভাপতি দেবব্রত পাল সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আমন্ত্রিত বক্তা ডা. কুমার কান্তি দাস অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে বিবাহের পূর্বে রক্ত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। তিনি বলেন, প্রাক-বিবাহ রক্ত পরীক্ষা চালু হলে আগামী প্রজন্মকে থ্যালাসেমিয়ার মতো ভয়াবহ রোগের হাত থেকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব।

ডা. সিতাংশু দাম তাঁর বিস্তারিত আলোচনায় থ্যালাসেমিয়া রোগের উৎপত্তি, লক্ষণ, জটিলতা, প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। সহজ ভাষায় তিনি ব্যাখ্যা করেন কীভাবে এই বংশগত রোগ ধীরে ধীরে একজন শিশুর জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এবং সময়মতো সচেতনতা ও পরীক্ষার মাধ্যমে কীভাবে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাঁর বক্তব্যে উপস্থিত শ্রোতারা বিশেষভাবে উপকৃত হন।

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মহাবীর জৈন থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে নতুন তথ্য জেনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সমাজে আরও বেশি সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান। ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আশু পাল অত্যন্ত সরল ও বোধগম্য ভাষায় থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, শুধুমাত্র একটি সচেতন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আজীবনের কষ্ট থেকে বাঁচাতে পারে।

তিনি বিশেষভাবে বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া বাহক পরীক্ষা করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সেমিনারের অন্তিম পর্বে বক্তা সুভাষ চৌধুরী স্লাইড প্রদর্শনের মাধ্যমে হৃদরোগের ভয়াবহতা এবং সুস্থ জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।

সভায় উপস্থিত ছিলেন একাধিক থ্যালাসেমিয়া রোগী ও তাঁদের অভিভাবক। তাঁদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন ডা. সিতাংশু দাম। পাশাপাশি হায়দরাবাদ থ্যালাসেমিয়া অ্যান্ড সিক্‌ল সেল সোসাইটির মাধ্যমে কীভাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সম্ভাব্য সব ধরনের চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া সম্ভব, সেই বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভা থেকে সরকারের প্রতি জোরালো আবেদন জানানো হয় যাতে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের স্বার্থে বর-কন্যার প্রাক-বিবাহ থ্যালাসেমিয়া বাহক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা হয়। বক্তারা মনে করেন, সচেতনতা ও সময়োচিত পরীক্ষা ছাড়া এই রোগ নির্মূল করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, দিনব্যাপী আয়োজিত উভয় কর্মসূচিতেই বরাক ভ্যালি ভলান্টারি ব্লাড ডোনার্স ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটি, কাছাড় জেলা কমিটি, হাইলাকান্দি জেলা কমিটি এবং মহিলা শাখার বিভিন্ন পদাধিকারী ও সদস্যরা সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন।

ফোরামের কেন্দ্রীয় প্রচার সচিব সুজয় নাথ এক প্রেসবার্তায় জানিয়েছেন, রজতজয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে আগামী এক বছর ধরে বরাক উপত্যকার বিভিন্ন প্রান্তে রক্তদান, স্বাস্থ্য সচেতনতা, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ এবং মানবিক সহায়তামূলক একাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। মানবতার সেবায় সংগঠনের এই দীর্ঘ যাত্রা আগামী দিনেও আরও বিস্তৃত হবে বলেই আশাবাদী সংগঠনের সদস্যরা।

Related Posts

কাটিগড়ায় যানজটের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযান

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১৪ মেঃ দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট, অবৈধ পার্কিং, রাস্তা দখল এবং নিয়ন্ত্রণহীন যান চলাচলের কারণে কার্যত নাজেহাল হয়ে উঠেছিল কাটিগড়া বাজার এলাকা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চেরাগী…

শ্রীভুমি জেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল মৃত্যুফাঁদে পরিণত

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১৪ মেঃ শ্রীভুমিজেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল আজ যেন ধুঁকতে থাকা এক ভাঙাচোরা চরম বেহাল দশা। বাইরে থেকে বিশাল ভবন, সরকারি উন্নয়নের নানা দাবি, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেই…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *