বরাকের লাইফ লাইন এখন মরণফাঁদে পরিণত! কালাইন বাজারে ৬ নং জাতীয় সড়কের বেহাল দশায় জনরোষ তুঙ্গে

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা ও মণিপুরকে সংযুক্ত করা এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ক আজ সম্পূর্ণভাবে অবহেলা ও দুর্নীতির শিকার। প্রতিদিন শত শত পণ্যবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস, অ্যাম্বুলেন্স, স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সড়ক ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।

কালাইন বাজার ও চৌরঙ্গী বাজার এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে ক্রেতাদের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যানজট, দুর্ঘটনার আশঙ্কা এবং দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহন আটকে থাকার ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ীর দাবি, গত কয়েক মাসে তাদের আয় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীদের দুর্ভোগ আরও প্রকট। প্রতিদিন স্কুল ও কলেজে যাতায়াত করতে গিয়ে তাদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

অভিভাবকদের অভিযোগ, বৃষ্টির দিনে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোই এখন এক ধরনের দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু শিক্ষার্থী সময়মতো বিদ্যালয় ও কলেজে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে শিক্ষাব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষায়, সড়কের উপর সৃষ্টি হওয়া গর্তগুলো আর সাধারণ গর্ত নয়, এগুলো এখন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। বৃষ্টির জল জমে থাকায় গর্তের গভীরতা বোঝার উপায় থাকে না।

ফলে প্রায়শই ট্রাক, বাস ও ছোট গাড়ি গর্তে আটকে পড়ছে। কখনও কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দিনের পর দিন যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি হলেই জাতীয় সড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে পড়ার ঘটনা ঘটছে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা রোগীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে সড়ক সংস্কারের নামে বরাদ্দ হওয়া কোটি কোটি টাকার ব্যবহার নিয়ে। এলাকাবাসীর দাবি, গত কয়েক বছরে একাধিকবার সংস্কারের নামে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং প্রতি বছর বর্ষা এলেই নতুন করে সড়ক ভেঙে পড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, যদি সংস্কারের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে মাত্র এক বছরের মধ্যে জাতীয় সড়কের অবস্থা এত ভয়াবহ হয়ে উঠল কীভাবে?

কারা এই কাজের দায়িত্বে ছিলেন? কাজের গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে থাকলেও প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। উন্নয়নের বড় বড় দাবি এবং বিজ্ঞাপনের বিপরীতে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে দাবি স্থানীয়দের। জনগণের একাংশের মতে, বরাক উপত্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছালেও প্রশাসনের জরুরি উদ্যোগের অভাব অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়লেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।

মঙ্গলবার কালাইন ব্লকে এক সংবর্ধনা সভা শেষে স্থানীয় বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের কাছে জাতীয় সড়কের বেহাল অবস্থা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বৃষ্টি থামলেই প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হবে। তিনি আরও জানান, মালিডহর থেকে বদরপুর পর্যন্ত দীর্ঘ অংশ কংক্রিট বা ঢালাইয়ের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে নির্মাণের লক্ষ্যে আরও বৃহৎ প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি সড়কের পাশে আধুনিক স্ট্রিট লাইট স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সড়ক সংস্কারের জন্য মঞ্জুর হওয়া ১৫ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম ও খেলিমেলির অভিযোগ তোলেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, সঠিকভাবে কাজ হলে এক বছরের মধ্যে জাতীয় সড়কের এই অবস্থা হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি তিনি বিধানসভায় উত্থাপন করবেন বলেও জানান। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

এদিকে কাটিগড়া ও কালাইন জুড়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী মহল, ছাত্র সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন, দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যে কোনো সময় বৃহত্তর গণআন্দোলনের সূত্রপাত হতে পারে। জনসাধারণের বক্তব্য, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, এবার বাস্তব কাজ দেখতে চান তারা।

কারণ বছরের পর বছর ধরে আশ্বাস শুনতে শুনতে মানুষ ক্লান্ত। বরাক উপত্যকার অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং আন্তঃরাজ্য যোগাযোগের স্বার্থে ৬ নং জাতীয় সড়কের স্থায়ী ও মানসম্মত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। বরাকের প্রাণরেখা হিসেবে পরিচিত এই জাতীয় সড়ক আজ যদি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তবে তা শুধু একটি রাস্তার সংকট নয়, এটি গোটা অঞ্চলের উন্নয়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

Related Posts

Is Cachar’s Sewa Setu Under the Grip of a Syndicate? General Citizens Allegedly Harassed by Middlemen at the Registration Office (PFC)

Allegations of Collusion Against PFC Staff as Victims Claim Transparency Has Been Replaced by Harassment Barak Bani Digital Desk,Silchar,19 July : The Assam Government introduced the Sewa Setu platform and…

Allegations of Money Collection in the Name of Hailakandi District Social Welfare Department Spark Concern

Complaint Filed at Katakhal Police Outpost Over Alleged Fraud of ₹90,500 from Several Anganwadi Workers Barak Bani Digital Desk, Hailakandi, July 8, 2026: A serious controversy has emerged surrounding the…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *