শপথের দিন ১,০০০ কোটি, দুই সপ্তাহে আরও ৭৫০ কোটি, চলতি বছরেই ঋণগ্রহণের অঙ্ক ১১,৮০০ কোটি ছুঁইছুঁই
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২৪ মেঃ উন্নয়ন, পরিকাঠামো, বিনিয়োগ এবং ডাবল ইঞ্জিন সরকারের সাফল্যের বার্তা সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল অসমের শাসক শিবির। কিন্তু সরকার গঠনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারের ব্যয়ের চাপ ও ধারাবাহিক ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফলে অসম ক্রমশ ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে উঠছে।
সরকারি সূত্রে প্রকাশিত তথ্য ও অর্থ দপ্তরের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে বিরোধী মহল দাবি তুলেছে, নতুন কার্যকালের শুরুতেই আবারও ৭৫০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজ্যের আর্থিক অবস্থার বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। জানা গেছে, আগামী ২৬ মে সরকারি বন্ডের মাধ্যমে এই ঋণ সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং এর ওপর বছরে প্রায় ৭.৬২ শতাংশ হারে সুদ বহন করতে হবে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সাধারণ মানুষের সামনে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে রাজ্য পরিচালনায় ঋণের ওপর নির্ভরতা কমার বদলে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, রাজ্যের রাজস্ব বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং আয় বৃদ্ধির বিকল্প পরিকল্পনা স্পষ্ট না হয়ে ধারনির্ভর প্রশাসনিক ব্যয়ই এখন প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে শপথ গ্রহণের সময়কালকে ঘিরে। সমালোচকদের দাবি, নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক সূচনার দিন অর্থাৎ ১২ মে সরকার ১,০০০ কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করে কার্যত নতুন মেয়াদের অর্থনৈতিক পথচলা শুরু করেছে। আর তার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় আরও ৭৫০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, সরকারের নগদ প্রবাহ ও ব্যয় কাঠামো কতটা চাপের মধ্যে রয়েছে?
বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, যদি কার্যকালের শুরুতেই বড় অঙ্কের ধার নিতে হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে প্রশাসনিক ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এদিকে অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ বলছেন, ঋণ গ্রহণ নিজে কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারই উন্নয়নমূলক ব্যয়, অবকাঠামো নির্মাণ, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ঋণ নেয়।
তবে মূল প্রশ্ন হলো, সেই ঋণ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, ভবিষ্যতে তার আর্থিক প্রতিফল কী হবে এবং ঋণের তুলনায় রাজস্ব আয় কতটা বাড়ছে। রাজনৈতিক সমালোচনায় আরও দাবি করা হচ্ছে, চলতি অর্থবর্ষে ইতোমধ্যেই মোট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ১১,৮০০ কোটি টাকা স্পর্শ করেছে। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে রাজ্যের সামগ্রিক দায়বদ্ধতার অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। বিরোধীদের বক্তব্য, দীর্ঘমেয়াদে ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ সাধারণ মানুষের ওপরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এসে পড়ে।
অন্যদিকে সরকারপন্থী মহলের যুক্তি, বড় রাজ্যগুলির মতো অসমেও অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্পায়ন ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঋণ গ্রহণ একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তাদের দাবি, বর্তমান সরকার রাজ্যে বিনিয়োগ টানতে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে। তবে বিতর্ক থামছে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ তখনই কার্যকর হয় যখন তার বিপরীতে উৎপাদনশীল সম্পদ তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতের রাজস্ব বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। অন্যথায় ধারাবাহিক ঋণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। এখন নজর আগামী দিনের দিকে রাজ্য সরকার কি ঋণের পাশাপাশি রাজস্ব বৃদ্ধির নতুন পথ দেখাতে পারবে, নাকি ঋণনির্ভর অর্থনীতি নিয়েই বিরোধীদের অভিযোগ আরও জোরালো হবে? সেই উত্তরই খুঁজছে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষ।







