রাতের অন্ধকারে পশু সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ, পরিবহণ ও পশুপালন বিভাগকে কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ সরকারের
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২০ মেঃ আন্তর্জাতিক পশু সুরক্ষা সংস্থা পেটা ইন্ডিয়ার গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে এবার সরব হলো রাজ্যের প্রশাসন। অসমের লখিমপুর জেলাজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অবৈধ গরু পাচার, পশুবাজারে অনিয়ম এবং পশুদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যের পশুপালন ও পশু চিকিৎসা বিভাগ ইতিমধ্যেই কড়া পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ জারি করেছে।
জেলার প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলিকে অবিলম্বে অভিযানে নামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি পশুপালন বিভাগের পরিচালক এবং লখিমপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জেলার পুলিশ সুপার, জেলা পরিষদের মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক এবং জেলা পরিবহণ আধিকারিকের উদ্দেশ্যে পৃথকভাবে আনুষ্ঠানিক নির্দেশপত্র পাঠানো হয়। সেই নির্দেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জেলার বিভিন্ন পশুবাজার ও গরু পরিবহণ ব্যবস্থার উপর কড়া নজরদারি চালিয়ে অবৈধ পশু পাচার রুখতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লখিমপুর জেলার বঙালমরা সহ একাধিক পশুবাজার। পেটা ইন্ডিয়ার এক স্বেচ্ছাসেবক সংবাদমাধ্যম এর সামনে বিস্ফোরক দাবি করে জানান, জেলার বিভিন্ন বাজার থেকে এখনও নিয়মবহির্ভূতভাবে গরু পাচার অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গভীর রাতে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে ট্রাক ও পিক-আপ গাড়িতে গরু বোঝাই করে নগাঁও সহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পশুগুলির কোনও স্বাস্থ্য পরীক্ষার শংসাপত্র থাকে না এবং পরিবহণের সময় পশুদের প্রতি চরম নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়।
সূত্রের খবর, গরুগুলিকে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক পরিবেশে গাদাগাদি করে বোঝাই করা হয়। অনেক সময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় তাদের জন্য না থাকে পর্যাপ্ত খাদ্য, না থাকে পানীয় জলের ব্যবস্থা। ফলে বহু পশু অসুস্থ হয়ে পড়ছে, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পশু অধিকার কর্মীদের মতে, এটি শুধু আইন ভঙ্গ নয়, বরং এক নির্মম ও সংগঠিত নিষ্ঠুরতার চিত্র।
অভিযোগপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই কার্যকলাপ পশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ১৯৬০-এর একাধিক ধারার সরাসরি লঙ্ঘন। বিশেষ করে ধারা ৩, ১১(১)(ক), ১১(১)(ঘ), ১১(১)(ঙ), ১১(১)(ট) এবং ৩৮(৩)-এর বিধান ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি পশু পরিবহণ বিধি, ১৯৭৮-এর নিয়ম ৪৭ থেকে ৫৬, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩-এর ধারা ৩(৫) ও ৩২৫, কেন্দ্রীয় মোটর যানবাহন বিধি, ২০১৬-এর নিয়ম ১২৫ই এবং মোটর যানবাহন আইন, ১৯৮৮ এর ধারা ১৭৭ লঙ্ঘনের কথাও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় মোটর যানবাহন বিধির ১২৫ই ধারায় পশু বহনের জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও মানবিক মানদণ্ড স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সেই সমস্ত নিয়মকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেই বছরের পর বছর ধরে এই অবৈধ ব্যবসা চালানো হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক নজরদারি ও স্থানীয় স্তরের দায়িত্বশীল মহলের ভূমিকা নিয়েও।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই লখিমপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পশুপালন বিভাগকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর জেলার পশুপালন ও পশু চিকিৎসা আধিকারিক ডা. অক্ষয়বট কেশরী পুলিশ ও পরিবহণ বিভাগকে পশুবাজারগুলি পরিদর্শন করা, পশুর প্রবেশ ও প্রস্থানের নথিভুক্তি নিশ্চিত করা এবং সন্দেহজনক যানবাহনের উপর কড়া নজরদারি চালানোর অনুরোধ জানান।
পরবর্তীতে এপ্রিলে রাজ্য পশুপালন ও পশু চিকিৎসা বিভাগের পরিচালনালয় থেকেও জেলার পুলিশ সুপারের কাছে বিশেষ নির্দেশ পাঠানো হয়। তাতে গোটা বিষয়টির উপর দ্রুত তদন্ত চালিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলিকে এই বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কোনওভাবেই অবৈধ পশু পাচারচক্র সক্রিয় থাকতে না পারে।
এদিকে, এই ঘটনায় রাজ্যজুড়ে পশু সুরক্ষা কর্মী, পরিবেশপ্রেমী এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বহু সংগঠন ইতিমধ্যেই দাবি তুলেছে, শুধুমাত্র নির্দেশ জারি করলেই চলবে না, বরং নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ পশু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চক্রকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী ও দুর্গম এলাকাগুলিতেও নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। বর্তমানে গোটা রাজ্যের নজর এখন লখিমপুর জেলা পুলিশ, পরিবহণ বিভাগ এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এই অবৈধ পশু পাচারচক্রের বিরুদ্ধে সত্যিই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় কিনা, নাকি আগের মতোই অভিযোগের ফাইল প্রশাসনিক টেবিলে চাপা পড়ে যায়, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে। পশু অধিকার রক্ষাকারী সংগঠনগুলির দাবি, আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করে দোষীদের বিরুদ্ধে উদাহরণমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতেও এই ধরনের অমানবিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব হবে না।






