মাদারপুরে নদীগর্ভে তলিয়ে গেল ১০টি পরিবারের ভিটেমাটি, বাড়িঘর হারিয়ে আশ্রয় শিবিরে, আতঙ্কে নির্ঘুম গোটা এলাকা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ কাটিগড়ার মাদারপুরে আবারও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে বরাক নদী। গোবিন্দপুরের পর এবার জিকে ডাইকের মাদারপুর অংশে ভয়াবহ ভূমিধস ও নদীভাঙনে মুহূর্তের মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে অন্তত ১০টি বসতভিটে। অবিরাম বর্ষণ আর উত্তাল বরাকের রুদ্রস্রোতে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে গোটা এলাকা।
সর্বস্ব হারিয়ে বহু পরিবার এখন আশ্রয় নিয়েছে মাদারপুর পাবলিক এমই স্কুলে খোলা অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে। শুধু যাঁদের ঘরবাড়ি ভেঙে নদীতে তলিয়ে গেছে তারাই নন, এখনও ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা আরও প্রায় ২০টি পরিবার চরম অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয়দের কথায়, নদী এখন আর ধীরে ধীরে ভাঙছে না, গোটা মাটি একসঙ্গে ধসে পড়ছে।
গত রাতভর মুষলধারে বৃষ্টির পর নদীপাড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দেয়। তারপর বিকট শব্দে একের পর এক মাটির চাঙড় ভেঙে বরাকের গর্ভে তলিয়ে যেতে থাকে। স্থানীয়রা জানান, রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বারবার শোনা যাচ্ছিল মাটিধসের গর্জন। আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। কেউ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, কেউ গবাদিপশু, কেউবা ঘরের আসবাব বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
চোখের সামনে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বহু পরিবারের সারাজীবনের সঞ্চয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ভিটেমাটি হারানো এক বৃদ্ধার কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ, আমাদের বাঁচানোর কেউ নেই। কতবার বলেছি বাঁধ বাঁচান, জিওব্যাগ ফেলুন, কিন্তু কেউ শুনল না। এখন সব শেষ। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বরাক নদীর এই ভয়াবহ ভাঙন কোনো নতুন ঘটনা নয়।

দীর্ঘদিন ধরেই নদীপাড়ে ধসের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। বারবার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ, জলসম্পদ বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে লিখিত ও মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যত কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, কাগজে-কলমে প্রকল্পের কথা বলা হলেও বাস্তবে নদী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
স্থানীয়দের মতে, বর্ষা এলেই প্রশাসনের তরফে কিছু অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু বর্ষা কাটলেই সব প্রতিশ্রুতি হারিয়ে যায় ফাইলের স্তূপে। ফলে প্রতি বছর একইভাবে আতঙ্ক, একইভাবে ঘরহারা হওয়ার যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে নদীপারের মানুষদের। এলাকাবাসীর ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে কারণ তাঁদের দাবি, কয়েক মাস আগেও নদীপাড়ে বিপজ্জনক ফাটল তৈরি হয়েছিল।
তখনই যদি জরুরি ভিত্তিতে বোল্ডার ফেলা, জিওব্যাগ বসানো এবং শক্তিশালী প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণ করা হতো, তাহলে আজ এত বড় বিপর্যয় নেমে আসত না। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, প্রশাসনের উদাসীনতা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের চরম গাফিলতির ফলেই আজ বহু পরিবার সর্বস্বান্ত। তাঁদের প্রশ্ন, মানুষ নদীতে তলিয়ে যাওয়ার পরই কি সরকারি যন্ত্র নড়ে বসবে?
বর্তমানে মাদারপুর পাবলিক এমই স্কুলে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলির অবস্থা অত্যন্ত করুণ। শিশুদের খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধপত্র এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই খোলা মেঝেতে রাত কাটাচ্ছেন। মহিলাদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মাদারপুরে বরাক নদীর ভয়াবহ ভাঙন এখন আর শুধুমাত্র একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। নদীর করাল গ্রাসে একের পর এক বসতভিটে বিলীন হয়ে যাওয়ার পরও পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট বিভাগ এমনটাই অভিযোগ ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর।
এদিকে কাটিগড়া সার্কেলের আধিকারিক যাত্রা কান্ত কর্মকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসনের আশ্বাস দিলেও সেই আশ্বাসে ভরসা রাখতে পারছেন না স্থানীয়রা। তাঁদের বক্তব্য, প্রতি বছর বর্ষা এলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে নদীভাঙন রোধে কার্যকর কোনো স্থায়ী উদ্যোগ দেখা যায় না। ক্ষোভ উগরে দিয়ে এক ভিটেহারা বাসিন্দার কথায়, আশ্বাসে পেট ভরে না, নদীতে ভেসে যাওয়া ঘরও আর ফিরে আসে না। আজ আমরা রাস্তায়, কাল হয়তো পুরো গ্রামটাই থাকবে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু বছর ধরেই বরাক নদীর এই ভয়ংকর ভাঙনের বিষয়ে প্রশাসন ও জলসম্পদ বিভাগকে সতর্ক করা হচ্ছিল। নদীপাড়ে ফাটল, মাটিধস ও ক্রমাগত ভূমিক্ষয়ের কথা জানিয়ে বারবার আবেদন জানানো হলেও কার্যত কোনো স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। জিওব্যাগ, বোল্ডার ফেলা কিংবা শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের মতো জরুরি পদক্ষেপের দাবি দীর্ঘদিন ধরে উঠলেও তা সীমাবদ্ধ থেকেছে শুধু কাগজে-কলমে।
গ্রামবাসীদের প্রশ্ন, প্রতিবছর নদীভাঙন প্রতিরোধের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে সেই কাজ কোথায়? কেন প্রতি বর্ষায় একইভাবে ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে বসতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে? তাঁদের অভিযোগ, পরিকল্পনার অভাব, নিম্নমানের কাজ এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার ফলেই আজ মাদারপুর ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে।
বর্তমানে গোটা মাদারপুর কার্যত এক মানবিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। নদীর পাড়ে এখনও সক্রিয় রয়েছে বড় বড় ফাটল। এলাকাবাসীরা জানান, মাঝেমধ্যেই বিকট শব্দে মাটি ধসে পড়ছে নদীতে। ফলে যেকোনো মুহূর্তে আরও বহু বাড়িঘর, রাস্তা এবং কৃষিজমি বরাকের গর্ভে তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আতঙ্কে রাতের ঘুম উড়েছে গোটা এলাকার মানুষের। বহু পরিবার মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
কেউ কেউ আবার আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। সবচেয়ে করুণ অবস্থায় রয়েছেন শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও অসুস্থ মানুষরা। অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের। ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলা বলেন, রাতে ঘুমোতে ভয় লাগে। কখন যে মাটি ভেঙে ঘর নদীতে চলে যায়, সেই আতঙ্কে পুরো পরিবার জেগে থাকি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের তরফে এখনো পর্যন্ত কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে কার্যকলাপ। অথচ প্রয়োজন ছিল জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে নদীপাড়ে জিওব্যাগ ফেলা, বোল্ডার বসানো, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই মাদারপুর গ্রামের বৃহৎ অংশ বরাক নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এবার যদি প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, মানুষ সব হারিয়ে রাস্তায় নামার পর শুধু ত্রাণ বিলি করে দায় এড়ানো যাবে না। এই বিপর্যয়ের দায় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকেই নিতে হবে। বরাকের ভয়াল ভাঙনে আজ মাদারপুরে শুধু মাটি ভাঙছে না, ভেঙে পড়ছে মানুষের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা আর প্রশাসনের উপর শেষ ভরসাটুকুও।





