বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ সোনাইর মানুষ বহুদিন ধরেই যেন এক ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। জাতীয় সড়কের নাম থাকলেও বাস্তবে ৩০৬ নং শিলচর–আইজল সড়কের একাধিক অংশ এখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। খানাখন্দে ভরা রাস্তা, সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসম জল, প্রতিদিন দুর্ঘটনার আশঙ্কা এই দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যেই এবার সরাসরি একশন মুডে দেখা গেল সোনাইর বিধায়ক আমিনুল হক লস্করকে। আর সেই কারণেই দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, হতাশা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে জাতীয় সড়কের বেহাল বাস্তবতা।
শনিবার উত্তর কৃষ্ণপুরের প্রেসিডেন্সি কলেজ সংলগ্ন এলাকায় জাতীয় সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হতেই এলাকায় কিছুটা স্বস্তির আবহ তৈরি হয়। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, এই কাজ কি শুধুই সাময়িক প্রলেপ, নাকি সত্যিই দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ? কারণ গত বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে শিলচর থেকে লায়লাপুর পর্যন্ত রাস্তার সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। অথচ মাত্র এক বছরের মাথায় সেই রাস্তার বুকজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ভয়ঙ্কর গর্ত। কোথাও কোথাও রাস্তার অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে দূর থেকে দেখলে সেটিকে রাস্তা নয়, বরং বৃষ্টির পানিতে ভরা ছোট ছোট পুকুর বলেই মনে হয়।
প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে হাজার হাজার ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করে। স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, রোগী নিয়ে ছুটে চলা অ্যাম্বুলেন্স, ব্যবসায়িক পণ্যবাহী ট্রাক থেকে শুরু করে সাধারণ যাত্রীবাহী যান সবাইকে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। রাস্তার গর্তে পানি জমে থাকায় কোথায় রাস্তা শেষ আর কোথায় গর্ত শুরু, তা বোঝার উপায় থাকে না। ফলে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন এবং জাতীয় সড়ক নির্মাণকারী সংস্থার চরম গাফিলতি ও নিম্নমানের কাজের ফলেই আজ এই পরিস্থিতি। ঠিক এমনই এক দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেন বিধায়ক আমিনুল হক লস্কর। শুক্রবার উত্তর কৃষ্ণপুর এলাকায় একটি টুক-টুক অটো গভীর গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে দুই ব্যক্তি আহত হন। স্থানীয় এক বাসিন্দা দুর্ঘটনার ছবি ও তথ্য বিধায়কের কাছে পাঠাতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে এনএইচআইডিসিএল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর শনিবার থেকেই শুরু হয় প্রাথমিক সংস্কার কাজ। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে কাজের তদারকি করতেও দেখা যায় বিধায়ককে।
এই প্রসঙ্গে বিধায়ক আমিনুল হক লস্কর অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রাস্তা নিয়ে নো পলিটিক্স, নো কন্সিডার। রাস্তা মানুষের মৌলিক অধিকার। মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো রাজনীতি হওয়া উচিত নয়। যদি এই ইস্যুতে রাজনীতি হয়, তাহলে আমি নিজেই সড়কে বসে প্রতিবাদ করবো। বিধায়কের এই বক্তব্য ইতিমধ্যেই এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কারণ সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বহু বছর ধরেই জাতীয় সড়কের দুর্দশা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা হয়েছে, প্রতিশ্রুতি মিলেছে, বৈঠক হয়েছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়নি।
নির্বাচন এলেই রাস্তা মেরামতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, আর ভোট শেষ হতেই যেন সব ভুলে যায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে নির্মাণ কাজের গুণগত মান নিয়ে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত একটি জাতীয় সড়ক যদি এক বছরের মধ্যেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তাহলে দায় কার? ঠিকাদারি সংস্থা, তদারকি বিভাগ নাকি জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ এই দায় এড়াবে কে? সচেতন মহলের মতে, শুধুমাত্র গর্তে পাথর ফেলে দায়সারা সংস্কার করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, উন্নত মানের নির্মাণ সামগ্রী এবং কঠোর নজরদারি।
এদিকে শুধুমাত্র রাস্তার গর্ত নয়, জাতীয় সড়কের পাশে অসম্পূর্ণ ড্রেন নির্মাণ কাজ নিয়েও তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন বাজার এলাকায় বছরের পর বছর ধরে ড্রেনের কাজ অসম্পূর্ণ পড়ে রয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। সেই পানি সরাসরি রাস্তার উপর উঠে এসে রাস্তার ক্ষয় আরও দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেন নির্মাণের নামে বহু জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি করে কাজ ফেলে রাখা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে ব্যবসায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। অনেক সময় যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন আটকে থাকে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও। রোগী নিয়ে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে পড়ার অভিযোগ উঠেছে একাধিকবার।
সচেতন মহলের মতে, শুধু সাময়িক মেরামত নয়, এখন প্রয়োজন সম্পূর্ণ সড়ক ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন। রাস্তা নির্মাণে দুর্নীতি, নিম্নমানের কাজ এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে দায়ী সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে ভবিষ্যতেও একই পরিস্থিতি ফিরে আসবে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলার মাঝে অন্তত কাজ শুরু হওয়ায় কিছুটা আশার আলো দেখছেন সোনাইর মানুষ।
এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ শুধুই তাৎক্ষণিক চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল হয়ে থাকে, নাকি সত্যিই শিলচর–আইজল জাতীয় সড়ককে নিরাপদ ও আধুনিক রূপ দেওয়ার স্থায়ী পদক্ষেপে পরিণত হয়। কারণ এই রাস্তা শুধুমাত্র একটি যোগাযোগ মাধ্যম নয়, বরং বরাক উপত্যকার অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। সেই লাইফলাইন যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে ভোগান্তির ভার শেষ পর্যন্ত বইতে হয় সাধারণ মানুষকেই।






