আত্মসহায়ক সদস্যাদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জেলা প্রশাসনকে স্মারকলিপি, ১৫ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ আগষ্টঃ অসম সরকারের গ্রামীণ স্বনির্ভরতা কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এসআরএলএম–এনআরএলএম প্রকল্পকে ঘিরে এবার সামনে এসেছে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। কাছাড় জেলার সোনাই বিধানসভা কেন্দ্রের বাঁশকান্দি উন্নয়ন ব্লকের অধীন একাধিক স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (এসএইচজি) সদস্য অভিযোগ করেছেন, তাঁদের ঋণের প্রায় ২৫ লক্ষ ১ হাজার ৭১ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না মেলায় এবার তাঁরা কাছাড়ের জেলা আয়ুক্তের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছেন।
ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক (বিডিও) এর মাধ্যমে জমা দেওয়া স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এসআরএলএম জীবিকা সখী ফাতিমা বেগম লস্কর, তাঁর স্বামী নিজাম উদ্দিন লস্কর, বাবা লালু মিঞা এবং আরও কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছে ভবিষ্যতে অধিক পরিমাণ ঋণ পাইয়ে দেওয়া, বিনিয়োগ করলে বাড়তি লাভের সুযোগ এবং ব্যাংকের মাসিক ঋণকিস্তি পরিশোধ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই বহু মহিলা তাঁদের ঋণের অর্থ তাঁদের হাতে তুলে দেন বলে অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি শুধু প্রলোভনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই সদস্যদের বলা হয়, সহযোগিতা না করলে ভবিষ্যতে তাঁদের গোষ্ঠী আর কোনও সরকারি ঋণ পাবে না, এমনকি গোষ্ঠী বন্ধও হয়ে যেতে পারে। এই ভয় দেখিয়েই তাঁদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, হ্যান্ডনোট, চেক, লিখিত চুক্তিপত্র এবং মৌখিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে টাকা নেওয়া হয়। এমনকি কয়েকটি ক্ষেত্রে গোষ্ঠীর পদাধিকারীদের কাছ থেকে আগেভাগেই স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। প্রথমদিকে বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হলেও, পরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন যে, একই ধরনের অভিযোগ বহু গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই রয়েছে।
অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, বিষয়টি সামনে আসার পর তাঁরা একাধিকবার বাঁশকান্দি বিডিও কার্যালয়, ব্লক প্রজেক্ট ম্যানেজার (বিপিএম) অফিস, জেলা এসআরএলএম কার্যালয় সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরের দ্বারস্থ হন। স্মারকলিপিতে ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, সেখানে ফাতিমা বেগম লস্কর অর্থ গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং সুদ-সহ সমস্ত টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য তাঁদের অর্থ ফেরত পাননি বলে অভিযোগ।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশাসনের পরামর্শ অনুযায়ী লাখিপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, লাখিপুর থানা এবং শিলচর সদর থানায় পৃথক এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া জেলা এসআরএলএম অফিস, জেলার পুলিশ সুপার এবং রাজ্যের এক মন্ত্রীর কাছেও লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এতসব পদক্ষেপের পরও এখনও পর্যন্ত আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি কিংবা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে।
স্মারকলিপিতে ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠীগুলি প্রশাসনের কাছে পাঁচটি প্রধান দাবি জানিয়েছে, সম্পূর্ণ ঘটনার নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ তদন্ত, আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধার, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা, তদন্ত চলাকালীন সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও প্রমাণ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত লিখিতভাবে অবহিত করা।
এছাড়া তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ না হলে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে ধর্না, বিক্ষোভ, মিছিল এবং আরও বৃহত্তর গণআন্দোলন শুরু করবেন। স্মারকলিপি জমা দেওয়ার সময় এক ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছিলেন, আমাদের ‘লাখপতি দিদি’ বানাবেন। কিন্তু আমরা আজ ‘ভিখারি দিদি’হয়ে গেছি। স্বামী ছেলেদের কাছে প্রতিদিন অপমান শুনতে হচ্ছে। আমরা আমাদের কষ্টের টাকা ফিরে পাব তো? তাঁর এই মন্তব্য উপস্থিত বহু মহিলার মানসিক যন্ত্রণা ও হতাশার প্রতিফলন হিসেবে উঠে আসে।
গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই স্বনির্ভর গোষ্ঠীভিত্তিক ঋণ প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। অভিযোগকারীদের মতে, যদি এমন অভিযোগের দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত না হয়, তবে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিই নয়, ভবিষ্যতে সরকারি স্বনির্ভর প্রকল্পগুলির প্রতিও সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই তাঁরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।






