দখলদারদের রেহাই নয়, জলজট ইস্যুতে কঠোর বার্তা প্রশাসনের

জেলাকমিশনারের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক আধিকারিক, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী এবং শহরের বিশিষ্ট নাগরিকরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, শ্রীভূমির জলজট আর শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সমস্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সরকারি জমি দখল, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

প্রাক্তন মন্ত্রী তথা পাথারকান্দির বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু পাল সরাসরি সরকারি জমি দখল এবং অবৈধ নির্মাণকে জলজট সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জল নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ করে সরকারি জমিতে দোকানপাট ও বসতঘর নির্মাণ করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার ও গাড়ির স্ট্যান্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদি শহরকে কৃত্রিম বন্যা থেকে মুক্ত করতে হয়, তাহলে উচ্ছেদ অভিযানে কোনওরকম আপস করা চলবে না।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ৬ নং জাতীয় সড়ক এর দীর্ঘদিনের বেহাল অবস্থার প্রসঙ্গও। তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠি ইতিমধ্যেই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং জাতীয় সড়কের স্থায়ী সংস্কারের জন্য প্রকল্পও চূড়ান্ত হয়েছে। তাঁর দাবি, খুব শীঘ্রই ড্রেন, কালভার্ট ও রাস্তার সার্বিক উন্নয়নমূলক কাজ শুরু হবে। তবে স্থায়ী সংস্কার শুরু না হওয়া পর্যন্ত পথ চলাচলের উপযোগী রাখতে এনএইচআইডিসিএলকে নিয়মিত মেরামতির কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

পুরপতি রবীন্দ্রচন্দ্র দেবের পৌরহিত্যে অনুষ্ঠিত সভায় জেলাআয়ুক্ত প্রদীপ কুমার দ্বিবেদী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মানস প্রতীম চৌধুরী, প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ মিশন রঞ্জন দাস, উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক জাকারিয়া আহমদ (পান্না), দক্ষিণ করিমগঞ্জের বিধায়ক আমিনূর রশিদ চৌধুরী, উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান বিশ্বরূপ ভট্টাচার্য, বিজেপি জেলা সভাপতি সঞ্জীব বণিক, জেলা কংগ্রেস সভাপতি তাপস পুরকায়স্থ, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অনিল কুমার ত্রিপাঠী, সমাজসেবী সতু রায়, শিক্ষাবিদ ড. রাধিকারঞ্জন চক্রবর্তী, করিমগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ রজত শুভ্র পাল সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। সভায় পুরপতি রবীন্দ্রচন্দ্র দেব জানান, জলজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত সরকারি জমির জবরদখল সংক্রান্ত বিষয়ে ইতিমধ্যেই সার্কেল অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, আইন ও নিয়ম মেনেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শহরের মানুষকে জলজট থেকে মুক্তি দিতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।

তবে বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও সমালোচনামূলক বক্তব্য আসে প্রাক্তন সাংসদ মিশন রঞ্জন দাসের কাছ থেকে। তিনি অভিযোগ করেন, ২০০৬ সালের পর থেকে মাস্টার ড্রেন নির্মাণের নামে বহু বড় নালাকে সংকুচিত করে দেওয়া হয়েছে। ফলে জল ধারণ ও নিষ্কাশনের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। তাঁর মতে, যে প্রকল্প শহরকে রক্ষা করার কথা ছিল, সেই প্রকল্পের অপরিকল্পিত বাস্তবায়নই আজকের জলজটের অন্যতম কারণ। পরিকল্পনার ভুলের খেসারত এখন সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে।

সমাজসেবী সতু রায়ও প্রশাসন ও পুরসভার কার্যকলাপ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, ড্রেন পরিষ্কারের নামে নিয়মিত কাজের দাবি করা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ব্রজেন্দ্র রোডের একটি ড্রেন থেকে সোফা উদ্ধার হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি শুধু নাগরিক অসচেতনতার নয়, প্রশাসনিক নজরদারিরও ব্যর্থতার প্রতীক। যদি নিয়মিত পরিষ্কার করা হতো, তাহলে ড্রেনের ভেতরে সোফা পড়ে থাকার প্রশ্নই উঠত না। তিনি ওই এলাকার সরকারি জমি দখল ও জরিপের বিষয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান।

উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক জাকারিয়া আহমদ (পান্না) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে বলেন, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই হবে না। কোথায় কী পরিমাণ জল জমছে, কোন এলাকায় কী ধরনের পরিকাঠামো প্রয়োজন এসব নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে পরিকল্পনা নিতে হবে। তিনি ছোট হিউম পাইপের পরিবর্তে বড় আকারের কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাবও দেন। দক্ষিণ করিমগঞ্জের বিধায়ক আমিনূর রশিদ চৌধুরীও বড় নালাগুলিকে সংকুচিত করার সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন।

তাঁর মতে, আগে যে নালাগুলি স্বাভাবিকভাবে জল বহন করত, সেগুলির আয়তন কমিয়ে দেওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই শহর ডুবে যাচ্ছে। তবে তিনি শুধু প্রশাসনকে দায়ী না করে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নালা-নর্দমায় প্লাস্টিক ও আবর্জনা ফেলা বন্ধ না হলে কোনও প্রকল্পই দীর্ঘস্থায়ী ফল দেবে না। বৈঠকে জেলাআয়ুক্ত প্রদীপ কুমার দ্বিবেদীর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, সরকারি জমি দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রশাসন কোনও আপস করবে না। তাঁর ভাষায়, পুরসভা যদি আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়, তাহলে জেলা প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। সরকারি জমি দখল করে কেউ পার পাবে না।

নাগরিক মহলের মতে, এই বৈঠকে সমস্যার কারণগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হলেও প্রকৃত পরীক্ষা হবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। অতীতেও বহুবার বৈঠক, আলোচনা ও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। তাই এবারও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আলোচনা কি আবারও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই শুরু হবে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ড্রেন সংস্কার এবং বৈজ্ঞানিক নগর পরিকল্পনার কাজ? সভা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের উপর জোর দেওয়া হয়। তবে শ্রীভূমিবাসীর প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়, এবার দৃশ্যমান হোক কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ শহরের মানুষ আর নতুন আশ্বাস নয়, দীর্ঘদিনের জলজট ও কৃত্রিম বন্যা থেকে স্থায়ী মুক্তির বাস্তব সমাধান দেখতে চান।

Related Posts

Is Cachar’s Sewa Setu Under the Grip of a Syndicate? General Citizens Allegedly Harassed by Middlemen at the Registration Office (PFC)

Allegations of Collusion Against PFC Staff as Victims Claim Transparency Has Been Replaced by Harassment Barak Bani Digital Desk,Silchar,19 July : The Assam Government introduced the Sewa Setu platform and…

Allegations of Money Collection in the Name of Hailakandi District Social Welfare Department Spark Concern

Complaint Filed at Katakhal Police Outpost Over Alleged Fraud of ₹90,500 from Several Anganwadi Workers Barak Bani Digital Desk, Hailakandi, July 8, 2026: A serious controversy has emerged surrounding the…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *