জলজটের স্থায়ী সমাধান নয়, টার্গেটেড উচ্ছেদের প্রস্তুতি? ব্রজেন্দ্র রোডের জরিপ নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ সতু রায়ের

সামান্য বৃষ্টিতেই বহু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে, মানুষের ঘরে জল ঢুকে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রাস্তাঘাট অচল হয়ে পড়ে। অথচ এই সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে প্রশাসন এখন এমন এক জরিপে ব্যস্ত, যা নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এসইউসিআই জেলা সম্পাদক অরুণাংশু ভট্টাচার্য, আইনজীবী জ্যোতিষ পুরকায়স্থ, আইনজীবী আতিকুর বারি চৌধুরী, মহিলা নেত্রী পূর্ণিমা চৌধুরী এবং সিপিআই জেলা সম্পাদক চন্দন চক্রবর্তীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

সতু রায় অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালে ব্রজেন্দ্র রোড এলাকায় সার্কেল অফিসের পক্ষ থেকে একটি সরকারি জরিপ পরিচালিত হয়েছিল। সেই সময় নির্ধারিত সীমারেখা চিহ্নিত করতে সাদা দাগ বসানো হয়েছিল। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে একই এলাকায় পুনরায় জরিপ চালিয়ে এবার লাল দাগ বসানো হয়েছে, এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুই জরিপের ফলাফলের মধ্যে ব্যাপক অমিল দেখা যাচ্ছে।

তাঁর বক্তব্য, যদি আগের জরিপ সরকারি নিয়ম মেনেই করা হয়ে থাকে, তাহলে এত অল্প সময়ে নতুন জরিপে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফলাফল এল কীভাবে? আবার যদি বর্তমান জরিপ সঠিক হয়, তাহলে পূর্ববর্তী জরিপ কি ভুল ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনের কাছ থেকে শহরবাসী পাওয়ার অধিকার রাখে। তিনি আরও বলেন, সার্কেল অফিসে সংরক্ষিত পুরনো রেকর্ড ও মানচিত্রের সঙ্গে বর্তমানে ব্যবহৃত নতুন ম্যাপেরও কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

সতু রায়ের অভিযোগ অনুযায়ী, ব্রজেন্দ্র রোডের প্রবেশপথ তথা প্রাক্তন চিত্রবাণী সিনেমা হলের সামনের অংশ থেকে রাস্তার দুই পাশ ধরে জরিপ করার নির্দেশ ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, জরিপকারীরা রাস্তার মধ্যভাগ থেকে এবং একপাশ ঘেঁষে পরিমাপ শুরু করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, সরকারি নিয়ম ও নির্দেশনা যদি একরকম হয়, তবে বাস্তবে তার ব্যত্যয় ঘটল কেন? কোন ভিত্তিতে রাস্তার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তন করা হলো? এবং কেন এক বছর আগের সরকারি রেকর্ডকে উপেক্ষা করে নতুন একটি ম্যাপের ভিত্তিতে জরিপ চালানো হচ্ছে?

এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে যদি প্রশাসন উচ্ছেদ বা ভাঙচুরের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে তা আইনগত জটিলতার জন্ম দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। সতু রায় স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সরকারি জমি উদ্ধার অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রক্রিয়া হতে হবে আইনসম্মত, স্বচ্ছ এবং ন্যায়সঙ্গত। কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি, দোকানপাট বা জীবিকার ওপর অন্যায়ভাবে আঘাত হানা চলবে না। তিনি বলেন, যদি সরকারি জমি উদ্ধারের নামে বেআইনিভাবে মানুষের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙার চেষ্টা করা হয়, তাহলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াবে। তখন প্রশাসনকে কঠিন আইনি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।

সাংবাদিক সম্মেলনে আইনজীবী আতিকুর বারি চৌধুরী শহরের ড্রেনেজ প্রকল্প নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় যে নালা নির্মাণ করা হয়েছে, তার অধিকাংশই কার্যকর জল নিষ্কাশনের উপযোগী নয়। তিনি বলেন, অনেক নালার গভীরতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কোথাও কোথাও নালা নির্মাণ হলেও তার সঙ্গে প্রধান ড্রেনের সংযোগ নেই।

ফলে বৃষ্টির জল জমে থাকছে আগের মতোই। তাঁর আরও অভিযোগ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও কোথায় কত টাকা খরচ হয়েছে, কোন সংস্থা কাজ করেছে কিংবা প্রকল্পের মেয়াদ কত এসব তথ্য জানাতে বাধ্যতামূলক তথ্যফলকও বহু ক্ষেত্রে লাগানো হয়নি। এতে স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আতিকুর বারি চৌধুরী আরও দাবি করেন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের গার্ডওয়াল নির্মাণের ক্ষেত্রেও সরকারি জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। যদি প্রশাসন সত্যিই সরকারি জমি উদ্ধারে আন্তরিক হয়, তাহলে সব ক্ষেত্রেই সমান নীতি অনুসরণ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। সিপিআই জেলা সম্পাদক চন্দন চক্রবর্তী বলেন, জলজট কোনো একক এলাকার সমস্যা নয়। শহরের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ড বর্ষাকালে দুর্ভোগের শিকার হয়। তাঁর প্রশ্ন, যদি সত্যিই ডিমারকেশন প্রয়োজন হয়, তাহলে শুধু ব্রজেন্দ্র রোড বা এমএমএমসি রোড কেন? শহরের ২৭টি ওয়ার্ডেই সমানভাবে জরিপ করা হোক। আইনের প্রয়োগ যদি হয়, তবে তা সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, পুরো শহরের জল কি শুধুই ব্রজেন্দ্র রোড দিয়ে বের হবে? জল নিষ্কাশনের জন্য মাস্টার ড্রেন, খাল, প্রাকৃতিক জলপথ এবং সংযোগকারী নালাগুলোর সংস্কার না করে কয়েকটি এলাকা চিহ্নিত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। চন্দন চক্রবর্তীর অভিযোগ, প্রকৃত সমস্যা সমাধানের বদলে কিছু নির্দিষ্ট এলাকা ও জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যা নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।

সতু রায় জানান, গত ২৯ মে বিপিনচন্দ্র পাল স্মৃতি ভবনে অনুষ্ঠিত নাগরিক সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ৩ জুন শম্ভুসাগর পার্ক প্রাঙ্গণে এক গণধর্ণা কর্মসূচি পালিত হবে। এই কর্মসূচিতে শহরের জলজট সমস্যা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থা, জাতীয় সড়কের বেহাল দশা এবং বিতর্কিত জরিপ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হবে। তিনি দাবি করেন, প্রশাসন যদি নাগরিকদের উদ্বেগ ও অভিযোগকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে বৃহত্তর গণআন্দোলনের পথেও যেতে হতে পারে।

সাংবাদিক সম্মেলন থেকে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে, এক বছরে সরকারি ম্যাপ বদলে গেল কেন? দুই জরিপের ফলাফলে এত পার্থক্য কেন? ড্রেনেজ ব্যবস্থার মূল সমস্যাগুলো সমাধান না করে কেন নির্দিষ্ট এলাকাকে কেন্দ্র করে ডিমারকেশন করা হচ্ছে? এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন শহরবাসী জলজটের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন প্রশাসনের কাছেই প্রত্যাশা করছে শহরবাসী। কারণ নাগরিকদের মতে, জলজটের স্থায়ী সমাধান কেবল উচ্ছেদ বা ডিমারকেশন নয়; প্রয়োজন সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে পূর্ণ স্বচ্ছতা। ততদিন পর্যন্ত এই বিতর্ক ও অসন্তোষ যে থামবে না, তা স্পষ্ট।

Related Posts

Is Cachar’s Sewa Setu Under the Grip of a Syndicate? General Citizens Allegedly Harassed by Middlemen at the Registration Office (PFC)

Allegations of Collusion Against PFC Staff as Victims Claim Transparency Has Been Replaced by Harassment Barak Bani Digital Desk,Silchar,19 July : The Assam Government introduced the Sewa Setu platform and…

Allegations of Money Collection in the Name of Hailakandi District Social Welfare Department Spark Concern

Complaint Filed at Katakhal Police Outpost Over Alleged Fraud of ₹90,500 from Several Anganwadi Workers Barak Bani Digital Desk, Hailakandi, July 8, 2026: A serious controversy has emerged surrounding the…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *