নিয়মনীতি শিকেয়! অবাধে পাথর-বালি ও পাহাড় উজাড়, সিন্ডিকেট চক্রের রমরমা বাণিজ্য, কুম্ভ নিদ্রায় বনবিভাগ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ আগষ্টঃ উন্নয়ন নাকি সুপরিকল্পিত পরিবেশ ধ্বংসযজ্ঞ? কাছাড় জেলার কাটিগড়া বিধানসভা সমষ্টির কালাইন অঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর যেভাবে তাণ্ডব চালানো হচ্ছে, তাতে এই প্রশ্নই এখন এলাকাবাসীর মুখে মুখে। একসময় সবুজ পাহাড়, কুলকুল রবে বয়ে চলা ঝর্ণা আর কাঁচের মতো স্বচ্ছ নদী-ছড়ার জন্য পরিচিত কালাইন আজ মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। অভিযোগ উঠছে, উন্নয়নের নামে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র সরকারি নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলেশ্বর, কালাইনছড়া ও সিন্দুরা এলাকায় প্রতিদিন লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকার প্রাকৃতিক সম্পদ।
কালাইনের আকাশে-বাতাসে এখন আর পাখির ডাক শোনা যায় না, বদলে দিন-রাত প্রতিধ্বনিত হয় ভারী জেসিপির বিকট শব্দ আর শত শত ট্রাকের গর্জন। স্থানীয়দের দাবি, পাহাড়ের ঢাল কেটে, নদীর বুক চিরে অবাধে পাথর ও বালি উত্তোলন করে ট্রিপার ও ট্রাকে বোঝাই করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি বহিঃরাজ্যেও। অথচ, এই বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ রোধে বন বিভাগ কিংবা জেলা প্রশাসনের কার্যকারী ভূমিকা প্রায় শূন্যের কোঠায়!

স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রচলিত সরকারি খনি আইন ও পরিবেশ সুরক্ষা বিধিমালাকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে প্রতিদিন কালাইনের নদী ও ছড়াগুলোতে জেসিপি নামিয়ে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করা হচ্ছে। অসমের সংশোধিত মাইনর মিনারেল কনসেশন রুলস (২০২৫) এবং মিনারেলস রেগুলেশন অ্যান্ড ডিলার্স রুলস (২০২০) অনুযায়ী, যে কোনো ধরণের খনিজ উত্তোলনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আইনি শর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক, সংশ্লিষ্ট উত্তোলনস্থলের বৈধ লিজ বা পারমিট। অনুমোদিত খনন পরিকল্পনা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র । জেলা সমীক্ষা রিপোর্ট বা এ সংশ্লিষ্ট এলাকার নাম থাকা। বার্ষিক উত্তোলনসীমা নির্ধারণ ও বৈধ ই-চালান বা ট্রানজিট পারমিট।
কিন্তু কালাইনের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশ্ন উঠছে, যদি এই বিপুল পরিমাণ উত্তোলন বৈধই হয়ে থাকে, তবে প্রশাসন কেন সাধারণ মানুষের সামনে লিজের পরিধি, অনুমোদিত উৎপাদনের পরিমাণ বা পরিবেশগত ছাড়পত্রের নথি প্রকাশ করছে না? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বড়াইল পাহাড়ের পাদদেশ ও তার সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি। অভিযোগ উঠেছে, পাথর বের করার তাগিদে কেটে ফেলা হচ্ছে একের পর এক পাহাড়ি টিলা, উজাড় হচ্ছে ঘন বনভূমি।

একসময় যেসব ছোট-বড় ঝর্ণা এলাকার জলের মূল উৎস ও সৌন্দর্যের প্রতীক ছিল, সেগুলোর বহুসংখ্যকই আজ হয় শুকিয়ে গেছে, না হয় মাটি-পাথরের ধ্বংসস্তূপে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, আজ যে পাহাড় কেটে কয়েক কোটি টাকা লাভ করা হচ্ছে, কাল তার খেসারত দিতে হবে গোটা কালাইনবাসীকে। জলসংকট আর ভূমিক্ষয়ে যখন ঘরবাড়ি ভাসবে, তখন এই রাজস্ব আর মুনাফা কোনো কাজে আসবে না।
বড়াইল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (বারাইল ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি) ও সংলগ্ন ইকো-সেনসিটিভ জোন (ইএসজেড)এর সীমানা ছুঁয়ে চলা এলাকাগুলোতে যেভাবে খনন ও পাথর উত্তোলনের কাজ চলছে, তা আইনত দণ্ডনীয়। সুরক্ষাবলয়ের মধ্যে কোনো ধরনের বাণিজ্যিকভাবে পাহাড় কাটা, বৃক্ষচ্ছেদন বা কোয়ারি পরিচালনা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কিন্তু কালাইন বন বিভাগ, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এবং জেলা প্রশাসনের নজরের সামনে দিয়েই প্রতিদিন দিন-দুপুরে কীভাবে পাথর বোঝাই ট্রাক ও ট্রিপার পার হয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও সংশয় দানা বাঁধছে।
যদি এই খনিজ পরিবহন বৈধ হয়, তবে তার চালানের স্বচ্ছতা কোথায়? আর যদি তা অবৈধ হয়, তবে এতদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন ঠোঙ্গা সেজে বসে আছে? সরকারি রাজস্বের বিপুল ক্ষতি এবং রাস্তার বেহাল দশাই প্রমাণ করে যে এই চক্রান্ত কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। কাঁচা রাস্তা নির্মাণ, সেতু গড়ে তোলা বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য পাথর ও বালির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই উন্নয়নের অজুহাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত প্রকৃতিকে শ্মশানে পরিণত করা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কালাইনের সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশপ্রেমীরা অবিলম্বে কালাইন এলাকায় এক যৌথ নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবিগুলোর মধ্যে প্রধান হলো, বলেশ্বর, কালাইনছড়া ও সিন্দুরা এলাকার প্রতিটি কোয়ারির অবস্থান, লিজের মেয়াদ এবং ডিএসআর এ অন্তর্ভুক্তি প্রকাশ্যে আনা। পরিবেশগত ছাড়পত্র (ইসি),ফরেস্ট অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ ক্লিয়ারেন্স এবং মাইন ক্লোজার প্ল্যান এর অস্তিত্ব খতিয়ে দেখা।
প্রতিদিন কতগুলি ট্রাক খনিজ পরিবহন করছে এবং সরকার কত টাকা রয়্যালটি ও রাজস্ব পাচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ অডিট করা। ইকো-সেনসিটিভ জোন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অবৈধ খনি বন্ধ করে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড় ও নদী পুনরুদ্ধারে বিশেষ পরিবেশ পুনর্বাসন পরিকল্পনা (এনভায়রনমেন্টাল রেস্টোরেশন প্ল্যান)বাস্তবায়ন করা।
প্রকৃতির সহনশীলতারও একটা চরম সীমা থাকে। আজ যদি প্রশাসন কালাইনের পাহাড়, নদী ও বন রক্ষায় অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নেয়, তবে খুব শিগগিরই বড়াইল পাহাড়ের পাদদেশের এই অনিন্দ্য সুন্দর ও সবুজ জনপদ কেবল ইতিহাস ও পুরানো ছবির পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। কালাইনবাসীর এক ও অভিন্ন সোজা কথা—উন্নয়নের দোহাই দিয়ে পরিবেশ ও প্রকৃতি লুট আর কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না!
পাহাড়ের পাদদেশে অনিয়ন্ত্রিত খনন ও মাটি কাটার ফলে ভূমিক্ষয় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, যা স্থানীয় প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বালি ও পাথর মাফিয়াদের অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের কারণে স্থানীয় ছড়া ও নদীগুলোর স্বাভাবিক নাব্য হারাল, বাড়ছে অকাল বন্যার ঝুঁকি। বনাঞ্চলের আয়তন সংকুচিত হওয়ায় অবলুপ্তির পথে স্থানীয় গাছপালা ও বন্যপ্রাণী।
দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত প্রভাবের পরোয়া না করে স্রেফ কতিপয় লাভখোর চক্রের পকেট ভারী করতেই এই প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের ধংসযজ্ঞ চলছে। বড়াইল পাহাড় কেবল ভৌগোলিক সৌন্দর্য নয়, এটি বরাক উপত্যকার জলবায়ু ও পরিবেশিক সুরক্ষাকবচ। সময় পেরিয়ে যাওয়ার আগেই প্রশাসনকে এই লুটপাট বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।





