জিরো টলারেন্স নীতির ফরমানকে কার্যত আই ডোন্ট কেয়ার! নিজেদের পকেট ভারী করেছে শক্তিশালী দালাল চক্র
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ আগষ্টঃ আসামের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চলবে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা রক্ষায় একের পর এক কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কাছাড় জেলার সমবায় সমিতি (কো-অপারেটিভ সোসাইটি) গুলোতে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এখানে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া ফরমানকে কার্যত ‘আই ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাব দেখিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করে চলেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। আসামের সংবিধান স্বীকৃত সমবায় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে কাছাড়ের একাধিক সমবায় সমিতি এখন চরম দুর্নীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিগত কয়েক মাস আগে কালাইন কো-অপারেটিভ সোসাইটির পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির আদ্যোপান্ত ফাঁস করেছিল আমাদের ‘বরাকবাণী’ সংবাদপত্র। সেই চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন নজর এড়ায়নি জেলা প্রশাসনেরও। ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে কাছাড়ের জেলা শাসক তড়িঘড়ি এক উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেন, যার প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত। কিন্তু কালাইনেই কি শেষ এই দুর্নীতির খেয়ালখুশি? আমাদের প্রতিবেদকের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের নিবিড় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ ও শিহরণ জাগানো সত্য, যা শুনলে যেকোনো সচেতন নাগরিকের কপাল চড়কগাছে ওঠার জোগাড় হবে!
রাষ্ট্রপতির অনুমোদিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ! কাছাড়ের কো-অপারেটিভগুলোতে অলিখিত সিন্ডিকেট রাজ
দুর্নীতি কেবল কালাইন কো-অপারেটিভ সোসাইটির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, লাগোয়া একাধিক সমবায় সমিতি ও স্থানীয় সংস্থায় ছড়িয়ে পড়েছে অনিয়মের বিষাক্ত শিকড়। আমানতকারীদের জমানো পুঁজি ও সরকারি অনুদানের বিপুল অর্থ তছরুপের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে মাঠপর্যায়ের তথ্যানুসন্ধানে। ভুয়ো নামের তালিকা তৈরি করে এবং নথি জালিয়াতির মাধ্যমে দিনের পর দিন স্রেফ কাগজে-কলমে চালানো হয়েছে সরকারি সহায়তা বন্টন।
প্রকৃত কৃষক, সাধারণ সদস্য ও খেটে খাওয়া মানুষ তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হলেও পকেট ভারী হয়েছে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও দালালচক্রের। কালাইনের ঘটনাটি ছিল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। জেলা শাসকের তদন্ত কমিটি যেভাবে এগোচ্ছে, তার পাশাপাশি আমাদের প্রতিবেদকের এই নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রমাণ করছে যে দুর্নীতির এই জাল অত্যন্ত গভীর ও সুসংগঠিত। প্রশাসন কি পারবে এই চক্রের মূল পণ্ডাদের আড়াল থেকে টেনে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে?
আইনের তোয়াক্কা নেই, নেই প্রশাসনিক ভয়। অলিখিত ক্ষমতার দাপটে কাছাড় জেলার সমবায় সমিতিগুলোতে চলছে একচ্ছত্র সিন্ডিকেটের রাজত্ব। আসামের সমবায় ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ২০০৭ সালের আসাম সমবায় সমিতি আইন (Assam Cooperative Societies Act, 2007), যা পরবর্তীতে ২০১২ সালে আসাম সংশোধন আইন (Assam Act No. IV of 2012) হিসেবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে বিধিবদ্ধ রূপ পেয়েছিল। সেই সংবিধান-স্বীকৃত আইনকেই প্রতিনিয়ত বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে জেলার একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও তাদের মদতপুষ্ট চক্র।
পুরো ব্যবস্থাটার চরম গলদ ও অরাজকতা বুঝতে খুব বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই; কালাইন কো-অপারেটিভ সোসাইটির বর্তমান অবস্থার দিকে চোখ রাখলেই থোকে থোকে উন্মোচিত হয় দুর্নীতির ভয়াবহ রূপচিত্র। যে আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষিজীবী ও সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা করা, কালাইনের মতো সমবায় সমিতিগুলোতে সেই ২০০৭/২০১২ সালের আইনি কাঠামো ও মূল নীতিগুলোকে পদদলিত করে চালানো হচ্ছে স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত। আইনগত পরিচালনা পর্ষদের পরিবর্তে অসাধু চক্র ও দালালদের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেটই সমিতিগুলোর ভাগ্য নির্ধারণ করছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে ঋণ বণ্টন বা সরকারি অনুদান সবক্ষেত্রেই চলছে অলিখিত হুকুমদারি।
বিগত দিনে কালাইন সমবায় সমিতিতে আমানতকারীদের অর্থ নয়ছয়, ভুয়ো খাতা তৈরি এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা আত্মসাতের যে পাহাড়প্রমাণ প্রমাণ মিলেছে, তা জেলা জুড়েই এক আতঙ্কজনক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। সমবায়ের আসল অংশীদার স্থানীয় কৃষক ও প্রান্তিক মানুষরা তাদের আইনসঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে, আইনের ফাঁকফোকর গলে ফুলেফেঁপে উঠছে সিন্ডিকেটের পকেট।
আইন অনুযায়ী, সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান পদটি সংবিধান স্বীকৃত এবং সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো! কাছাড়ের সিংহভাগ সমবায় সমিতিতে চেয়ারম্যানদের কার্যত ‘কলাগাছ’ বা পুতুল বানিয়ে রাখা হয়েছে। সমস্ত সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক লেনদেন এবং কার্যপরিচালনা থেকে চেয়ারম্যানকে অন্ধকারে রেখে অলিখিতভাবে সমস্ত ক্ষমতার চাবিকাঠি নিজেদের কুক্ষিগত করে রেখেছে এক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক মর্মান্তিক সত্য। আসাম সমবায় সমিতির সংবিধান আইন অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ও ক্ষমতা কতখানি, সে বিষয়ে অনেক নির্বাচিত চেয়ারম্যানেরই স্পষ্ট ধারণাটুকু পর্যন্ত নেই। নিজের পদের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার ও ক্ষমতার সীমানা জানা না থাকার ফলে, তাঁরা খুব সহজেই সমিতির সেক্রেটারিদের হাতের পুতুলে পরিণত হচ্ছেন।
নথিপত্রে চেয়ারম্যানের সই থাকলেও কলকাঠি নাড়ছে সেক্রেটারিদের নেতৃত্বাধীন শক্তপোক্ত একটি সিন্ডিকেট চক্র। চেয়ারম্যানকে কেবল সামনে রেখে পিছন থেকে কোটি কোটি টাকার নয়ছয় চালানোই এদের প্রধান কৌশল।
কালাইনের ঘটনাটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। কাছাড় জেলার অধিকাংশ কো-অপারেটিভ সোসাইটির অবস্থাই আজ এক সূত্রে গাঁথা। আমজনতা এবং কৃষকদের স্বার্থে গঠিত এই সমিতিগুলো আজ গুটি কতক অসাধু কর্মকর্তার আড্ডাস্থলে পরিণত হওয়ায় সাধারণ মানুষের আস্থা তলানিতে এসে ঠেকেছে।
জেলা শাসকের নির্দেশিত তদন্তে কালাইন কো-অপারেটিভের দুর্নীতির আসল মুখ উন্মোচিত হবে কি না, কিংবা এই সিন্ডিকেট চক্রের মাস্টারমাইন্ডদের বিরুদ্ধে সত্যি কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, এখন সেটাই দেখার।
কাছাড়ের সমবায় সমিতিগুলোকে কীভাবে ধ্বংসের অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে এই সেক্রেটারি সিন্ডিকেট চক্র এবং কীভাবে কোটি কোটি টাকার সরকারি তহবিল তছরুপ করা হচ্ছে, তার চাঞ্চল্যকর নথি ও বিস্তারিত তথ্য নিয়ে আসছে আমাদের আগামী দিনের বিশেষ এক্সক্লুসিভ ধারাবাহিক প্রতিবেদনে। চোখ রাখুন বরাকবাণীর পাতায়।





