কাজিরাঙার পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল কমানোর দাবিতে সরব স্থানীয়রা

বর্তমানে কাজিরাঙার চারপাশে নির্ধারিত ১০ কিলোমিটারের পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চলের পরিবর্তে ১ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে অসম সরকার। স্থানীয়দের বক্তব্য, ১০ কিলোমিটারের বিধিনিষেধের কারণে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন, বাড়িঘর নির্মাণ, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং উন্নয়নমূলক কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সরকারের প্রস্তাব দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান তাঁরা।

এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ১ কিলোমিটারের পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চলের বিরোধিতা করছেন। কিন্তু কাজিরাঙার আশপাশে বসবাসকারী মানুষ জানেন, ১০ কিলোমিটার অঞ্চলের বিধিনিষেধের কারণে তাঁরা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। কংগ্রেস নেতা তথা যোরহাটের সাংসদ গৌরব গগৈ ১০ কিলোমিটার অঞ্চল বজায় রাখার পক্ষে বক্তব্য দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওই বাসিন্দা।

হলধিবাড়িতে বিক্ষোভকারীরা কিছু সময়ের জন্য সড়ক অবরোধ করেন। পরে স্থানীয় প্রশাসনের হাতে স্মারকলিপি তুলে দিয়ে দ্রুত পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল কমানোর প্রস্তাব কার্যকর করার দাবি জানান তাঁরা। এর এক দিন আগে কাজিরাঙার কাছে অসম প্রদেশ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছিল। কংগ্রেসের অভিযোগ, পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চলের পরিধি কমিয়ে দিলে খনি কার্যকলাপের জন্য আইনি সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের একাংশ গৌরব গগৈয়ের বিরুদ্ধে কাজিরাঙা অঞ্চলের উন্নয়নমূলক প্রকল্পে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তাঁদের বক্তব্য, কাজিরাঙার স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা না করে শুধু রাজনৈতিক অবস্থান থেকে পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল নিয়ে আপত্তি জানানো উচিত নয়।

অসম জাতীয়তাবাদী যুব পরিষদও কাজিরাঙা সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের মতামতের ভিত্তিতে পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের বক্তব্য, কাজিরাঙাকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি জাতীয় উদ্যানের আশপাশে বসবাসকারী মানুষ ও গ্রামগুলির স্বার্থও রক্ষা করতে হবে। সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

মিসিং ছাত্র সংগঠন টিএমপিকে-ও মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। সংগঠনটি বসতিপূর্ণ এলাকায় পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চলের পরিধি শূন্য কিলোমিটার করার দাবি জানিয়েছে। মিসিং জিরোনি চরায় আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বোকাখাত ও কলিয়াবর এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরেই এই দাবি জানিয়ে আসছেন।

টিএমপিকে-র অভিযোগ, পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চলের বিধিনিষেধের কারণে স্থানীয়দের বাড়িঘর নির্মাণ, সামাজিক অনুষ্ঠান ও বিয়ে, উচ্চ শব্দে গান বাজানো, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পাকা বাড়ি নির্মাণের মতো বিভিন্ন কাজেও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সংগঠনটি কংগ্রেসকে বোকাখাত ও কাজিরাঙার মানুষের স্বার্থের বিরোধিতা না করার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে অসমের কৃষি ও সেচমন্ত্রী পীযূষ হাজরিকা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের সীমানায় কোনও পরিবর্তন করা হচ্ছে না। পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চলের পরিধি যৌক্তিক করার যে আলোচনা চলছে, তা জাতীয় উদ্যানের বাইরের এলাকাকে ঘিরেই। স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা এবং উন্নয়নের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি কাজিরাঙার সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য বলে তিনি জানান।

মন্ত্রী বলেন, পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল জাতীয় উদ্যানের মূল এলাকা থেকে নয়, জাতীয় উদ্যানের নির্ধারিত সীমানা থেকে হিসাব করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুসরণ করে সরকার কাজিরাঙার সীমানা থেকে ১ থেকে ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে নির্ধারণের প্রস্তাব বিবেচনা করছে।

সরকারের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাড়িঘর নির্মাণ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক কাজ সহজ হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থাও বজায় থাকবে।

অসম সরকার জানিয়েছে, আগামী দুই মাসের মধ্যে কাজিরাঙার জন্য নির্দিষ্ট এলাকা-ভিত্তিক পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল নির্ধারণের আবেদন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী বর্তমান ১০ কিলোমিটার অঞ্চল কার্যকর থাকবে বলে সাম্প্রতিক গৌহাটি হাইকোর্টের নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট দেশের প্রতিটি জাতীয় উদ্যান ও বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যের নির্ধারিত সীমানা থেকে অন্তত ১ কিলোমিটার পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। একই সঙ্গে আগে থেকে কার্যকর বা প্রস্তাবিত আরও বিস্তৃত বাফার অঞ্চল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ইতিমধ্যেই পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল কমানোর প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বোকাখাত ও কলিয়াবর সহ কাজিরাঙা সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। সরকারের আরও দাবি, ১০ কিলোমিটারের বিস্তৃত অঞ্চল থাকার কারণে ওই এলাকার পরিকাঠামো এবং নগর উন্নয়নের একাধিক প্রকল্প আটকে রয়েছে।

অন্যদিকে কংগ্রেসের অভিযোগ, পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চলের পরিধি কমানো হলে বেআইনি কয়লা উত্তোলন-সহ বৃহৎ পরিসরের খনন কার্যকলাপের জন্য আইনি সুযোগ তৈরি হতে পারে। পরিবেশবিদ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণকর্মীদের একাংশও প্রস্তাবিত পরিবর্তনের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সরকারের বক্তব্য, কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের সীমানা অপরিবর্তিত থাকবে।

পরিবেশ-সংবেদনশীল অঞ্চল নির্ধারণের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো একদিকে কাজিরাঙার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা করা এবং অন্যদিকে জাতীয় উদ্যানের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা ও উন্নয়নের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। সরকারের মতে, সংরক্ষণ ও উন্নয়নকে পরস্পরের পরিপন্থী না করে দুই ক্ষেত্রের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিয়েই কাজিরাঙার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

Related Posts

দুই বছরের নীরবতার পর পিএম কেয়ার্সের হিসাব প্রকাশ, ৮,৪৫২ কোটি টাকা তহবিলে পড়ে রয়েছে

এক বছরে খরচ মাত্র ৮৭ লক্ষ, অনুদান ও সুদে আয় ১,২০০ কোটির বেশি, স্বচ্ছতা নিয়ে সোচ্চার বিরোধীরা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ দুই বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে পিএম কেয়ার্স…

জনগণনার আগেই এনআরসি-র দাবিতে উত্তাল মণিপুর, দু’দিনের ধর্মঘটে ছাত্র সংগঠন

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত জনগণনা বন্ধের দাবি, ১৯৫১-কে ভিত্তিবর্ষ করার প্রস্তাব, বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে হিংসা ও অস্থিরতার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *