স্বাধীনতা দিবসের রক্তিম প্রভাতে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ঐতিহাসিক শঙ্খনাদ

৭৯তম স্বাধীনতা দিবসের মহিমান্বিত দিনে গুয়াহাটির ঐতিহাসিক ময়দানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া এক তেজস্বী ও দূরদর্শী ভাষণে এই যুগান্তকারী ঘোষণা করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। এই বিশাল ও ঐতিহাসিক বিনিয়োগের এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৫০ হাজার কোটি টাকা আসাম সরকার সম্পূর্ণ নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব, অর্থনৈতিক উৎস ও সম্পদ থেকেই ব্যয় করবে। ভারতের স্বাধীনতার শতবর্ষ অর্থাৎ ২০৪৭ সালের মধ্যে আসামকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও পূর্ণাঙ্গ ‘বিকশিত আসাম’ হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করার যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, এই বিশাল বিনিয়োগ হবে তার মূল চালিকাশক্তি ও মজবুত ভিত্তি।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেন অসমের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র। তাঁর দাবি, বিগত মাত্র এক দশকে রাজ্যের অর্থনীতির আকার এবং জিডিপি প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিবর্তনকে তিনি অসমের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। অসমের অর্থনীতির এই দ্রুত পরিবর্তনকে একটি প্রাঞ্জল ও তাৎপর্যপূর্ণ বাক্যবন্ধে ব্যাখ্যা করে মুখ্যমন্ত্রী একে চা থেকে চিপ এর মহাযাত্রা বলে অভিহিত করেন।

তাঁর বক্তব্যে, চা-শিল্পনির্ভর ঐতিহ্যবাহী অর্থনীতির গণ্ডি পেরিয়ে অসম এখন আধুনিক প্রযুক্তি, শিল্প ও নতুন বিনিয়োগের দিকে এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে রাজ্যে প্রস্তাবিত সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, চা থেকে চিপ এর এই যাত্রা অসমের অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ এবং ভবিষ্যৎ শিল্পোন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে।

ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী আসামের বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সীমানার কথা তুলে ধরে বলেন, আসামের কোনো নিজস্ব সমুদ্র উপকূল কিংবা বন্দর নেই, ওড়িশার মতো বিপুল প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদের অমূল্য প্রাচুর্যও আমাদের ভূমিতে নেই। তদুপরি, বহু দশক ধরে আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে উগ্রপন্থা, সশস্ত্র আন্দোলন ও নানা রক্তক্ষয়ী সংঘাতময় পরিস্থিতির মারাত্মক ধাক্কা সামলাতে হয়েছে।

কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতা ও বাধা-বিপত্তি জয় করে আজ আসাম নিজের শক্তিতে এক অনন্য ও স্বাবলম্বী উন্নয়নের মডেল গড়ে তুলেছে, যে গতিশীল ‘আসাম মডেল’কে আজ সমগ্র ভারতবর্ষ একবাক্যে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হচ্ছে। ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, মুখ্যমন্ত্রী, বিশ্ববিখ্যাত টাটা গ্রুপ কর্তৃক জগীরোডে স্থাপিত হতে যাওয়া কয়েক হাজার কোটি টাকার হাই-টেক সেমিকন্ডাক্টর শিল্প প্রকল্পকে আসামের এই নতুন শিল্প ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের এক বাস্তব ও জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী।

রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত ও ত্বরিত করার জন্য প্রস্তাবিত ১.৫০ লাখ কোটি টাকা নিম্নোক্ত গুরুত্বপূর্ণ খণ্ডগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ব্যয় করা হবে, রাজ্যজুড়ে বিশ্বমানের হাইওয়ে, দূরবর্তী অঞ্চলকে সংযোগকারী সেতু এবং গতিশীল পরিবহন ব্যবস্থা নির্মাণ। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত আধুনিকীকরণ এবং ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন। গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ছোট-বড় শহরগুলোতে বিশ্বমানের নাগরিক সুবিধা, ড্রেনেজ ও নতুন প্রকল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ।

সম্প্রতি আসামের পূর্বাঞ্চলীয় একাধিক জেলায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ও প্রলয়ংকারী বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির বিষাদময় চিত্র মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত আবেগপ্লুত কণ্ঠে স্মরণ করেন। বন্যায় প্রাণ হারানো নিরীহ ব্যক্তিদের শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে তিনি স্পষ্ট ও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন, বন্যাকবলিত ও ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর দ্রুততম সময়ে পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামোর পুনর্নির্মাণই বর্তমানে রাজ্য সরকারের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার। দুর্গত এলাকার পুনর্নির্মাণ, গৃহহীনদের সাহায্য এবং কৃষক-শ্রমিকদের পুনর্বাসনে সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের অর্থের টানাটানি বা অভাব হতে দেওয়া হবে না।

সামাজিক সংস্কারে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ১ নভেম্বর থেকে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ সামাজিক ব্যাধি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ বা জিরো-সহনশীল নীতি পুনর্ব্যক্ত করে মুখ্যমন্ত্রী এক বিশাল সামাজিক ক্রুসেডের ঘোষণা দেন। আগামী ১ নভেম্বর থেকে সমগ্র আসামজুড়ে বাল্যবিবাহের নির্মম সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে একটি সসর্বাত্মক ও কঠোর ৩০ দিনের বিশেষ অভিযান শুরু করা হবে। আসামের মাটি থেকে বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ সম্পূর্ণভাবে উৎখাত ও নিৰ্মূল না হওয়া পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের এই কঠোর অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।

আসামের উঠতি তরুণ প্রজন্মকে কেবল পশ্চিমা পরিভাষা ‘জেন জি’ কিংবা ‘জেন আলফা’ হিসেবে ভাগ করার কৃত্রিম ধারণাকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি এই বিভাগগুলোকে ইউরোপীয় মানসিকতার চিন্তাভাবনা” বলে আখ্যা দেন। এর পরিবর্তে, আসামের যুবক-যুবতীদের সত্যিকারের শারীরিক ও মানসিক দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাবলম্বিতা, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করতে একটি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বায়ত্তশাসিত যুব উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন বিভাগ’ গঠনের ঘোষণা দেন তিনি।

প্রশাসনকে সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং সরকারি কাজকর্মে আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্য দূর করার লক্ষ্যে দুটি ঐতিহাসিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত উন্মোচন করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সুবিধার্থে রাজ্যে আরও ৮টি নতুন সহ-জেলা গঠন করা হবে, যা স্থানীয় জনগণকে দ্রুত সরকারি সেবা প্রদানে সাহায্য করবে। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনিক কার্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জমে বা আটকে থাকা হাজার হাজার ফাইল ও কাগজপত্র ‘মিশন মোডে’ দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে সরকারি কাজের জন্য হয়রানির শিকার হতে না হয়।

স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই দিগন্তপ্রসারী ও বহুমুখী ঘোষণা সমগ্র রাজ্যজুড়ে এক অভূতপূর্ব আশা, বিশ্বাস ও উদ্দীপনার ঢেউ তুলেছে। একদিকে যেমন মেগা পরিকাঠামো ও শিল্পায়নে বিশাল মূলধনী বিনিয়োগের মাধ্যমে রাজ্য অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা আঁকা হয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণ ও গতিশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এক নতুন, স্বাবলম্বী, শক্তিশালী এবং বিকশিত আসাম’গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করা হয়েছে।

Related Posts

বিশ্বগুরু হওয়ার ফাঁপা দাবি! শীর্ষ দুই সংস্থা এনসিইআরটিতে অর্ধেকের বেশি এবং সিবিএসইতে ৪৪% পদ খালি

প্রাথমিকে ৬ কোটি পড়ুয়া থাকলেও উচ্চমাধ্যমিকে পৌঁছানোর আগেই স্কুলছুট ৭৩% শিক্ষার্থী, জাঁতাকলে বিশ্বমানের স্বপ্ন বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ আগষ্টঃ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দুই মূল স্তম্ভ, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ…

গোমূত্রে মিলবে লক্ষ্মী? লিটারপ্রতি ১০ টাকায় সংগ্রহের ধামাকা স্কিম উত্তরপ্রদেশে, রাজনৈতিক চর্চা তুঙ্গে

যোগীরাজ্যে লিটারপ্রতি ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে গোমূত্র! বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ আগষ্টঃ দুধ দেওয়া বন্ধ করে দিলে যে গরুকে এতদিন অনেকে গ্রামীণ অর্থনীতির বোঝা বলে মনে করতেন, সেই গরুই এবার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *