লালা হাসপাতালে পরিষেবা নয় যেন নার্সের চোখরাঙানি!

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের সেবা দেওয়ার পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর্মীদের এমন রুক্ষ, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উদ্ধত আচরণ সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাকে আরও একবার সাধারণ মানুষের সামনে হাঁড়ির খবর করে দিল। লালা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত বিতর্কিত নার্স আয়েশা বেগমের বিরুদ্ধে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সাথে প্রতিনিয়ত গাফিলতি, গা-ঘেঁষা দুর্ব্যবহার এবং অশ্রাব্য কটূক্তির গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বর্তমানে চরম ক্ষোভের ছাইচাপা আগুন জ্বলছে লালা শহরে।

অভিযোগের সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ আগস্ট রাত আনুমানিক ৮টা নাগাদ লালা সামূহিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কতিপয় আশঙ্কাজনক রোগীকে প্রাথমিক পরীক্ষার পর অন-ডিউটি চিকিৎসক জরুরি সেলাই এবং অবিলম্বে স্যালাইন চালুর নির্দেশ দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সের কাছে পাঠান। কিন্তু মূল ওয়ার্ড বা ডিউটি রুমে খোঁজ নিয়েও দেখা মেলেনি সেই নার্সের। ব্যথায় কোঁকড়াতে থাকা রোগীদের স্বজনরা ব্যাকুল হয়ে গোটা হাসপাতাল চত্বরে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

অবশেষে হাসপাতালেরই একটি নির্জন কক্ষে দেখা মেলে নার্স আয়েশা বেগমের। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, সেখানে তিনি অপর এক নার্স ও একজন বহিরাগত মহিলার সাথে আড্ডায় মত্ত ছিলেন। রোগীর ঝুলতে থাকা রক্ত আর যন্ত্রণার কথা স্মরণ করিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দ্রুত স্যালাইন দেওয়ার অনুরোধ জানাতেই যেন অগ্নিতে ঘৃতাহুতি হয়।

রোগীদের ওপর চড়াও হয়ে চরম অসৌজন্যমূলক ভাষায় নার্স স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এটি সরকারি হাসপাতাল, এখানে বেসরকারি হাসপাতালের মতো পরিষেবা আশা করা বোকামি। এমনকি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ জানিয়েও কোনো লাভ হবে না বলে রোগীর পরিবারের মুখে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন ওই বিতর্কিত স্বাস্থ্যকর্মী।

লালা হাসপাতালের এই অসংবেদনশীলতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযুক্ত নার্স আয়েশা বেগমের দুর্ব্যবহারের খতিয়ান বেশ দীর্ঘ ও পুরানো। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসার জন্য আসা একাধিক গর্ভবতী মহিলা ও দুস্থ সাধারণ রোগীদের সাথে চরম অমানবিক ও কটূক্তিপূর্ণ আচরণ করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ, হাসপাতালে মানুষ আসে জীবনের তাগিদে, একটু সহানুভূতি আর চিকিৎসার আশায়। কিন্তু এখানে এসে মিলছে কেবল অপমান আর লাঞ্ছনা। অভিযোগকারীদের কাছে এদিনের এই অপ্রীতিকর ঘটনার অডিও-ভিডিও প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এই খবর চাউর হতেই ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ। চরম গাফিলতি ও রোগী হয়রানির বিরুদ্ধে এবার আইনি ও প্রশাসনিক যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। ইতিমধ্যেই ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ করে এবং কড়া বিভাগীয় শাস্তির দাবি জানিয়ে লিখিত অভিযোগপত্র পাঠানো হয়েছে, হাইলাকান্দি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের জয়েন্ট ডিরেক্টর, হাইলাকান্দির মাননীয় জেলাশাসক, স্থানীয় লালার বিধায়ক ড. মিলন দাস ও আলগাপুরের বিধায়ক, লালা সামূহিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের এসডিএমও সমীপে।

অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। একটি সরকারি হাসপাতালে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের সরকারি বেতনভুক্ত হয়েও এমন স্বেচ্ছাচারী আচরণ পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা শূন্যে নামিয়ে আনে। তবে আইনের শাসন ও নিরপেক্ষতার স্বার্থে অভিযোগকারীদের পেশ করা উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ খতিয়ে দেখার পাশাপাশি অভিযুক্ত নার্স আয়েশা বেগমের বক্তব্যও শুনবে তদন্ত কমিটি এমনটাই প্রত্যাশা প্রশাসনিক মহলের।

এখন দেখার, ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের এই তীব্র ক্ষোভ ও পেশ করা অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসন কি অভিযুক্ত নার্সের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, নাকি আমলাতান্ত্রিক লালফিতার ফাসে ঢাকা পড়ে যাবে আরও একটি অমানবিক আখ্যান? উত্তরের অপেক্ষায় পথ চেয়ে রয়েছে লালার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

Related Posts

ভারতের রেলস্টেশনে জলের নামে বিষ গিলছেন ট্রেনের যাত্রীরা! ওয়াটার কুলারে বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া ই-কোলাইয়ের থাবা

হাওড়া, শিয়ালদহ ও নয়াদিল্লির কঙ্কালসার চেহারা, স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে রেলের চরম উদাসীনতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ আগষ্টঃ রেল প্ল্যাটফর্মে তৃষ্ণা মেটাতে গিয়ে গ্লাসে ভরা জল যে আসলে মারণ ব্যাকটেরিয়ার…

শিক্ষা উন্নয়নের টাকা লালফিতার ফাঁসে বন্দি! সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার অনুদান খরচই করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রক, সিএজি রিপোর্টে ফাঁস চাঞ্চল্যকর তথ্য

উচ্চশিক্ষার মান যাচাইয়ে ফেল মার্কার, ন্যাকের স্বীকৃতি ছাড়াই চলছে দেশের সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয় বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ আগষ্টঃ ভারতের ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদে প্রতি বছর কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে অঢেল অর্থ বরাদ্দের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *