রেলস্টেশনে যাত্রী পরিষেবার বেহাল দশা, ৮৯ শতাংশের বেশি স্টেশনে নেই ন্যূনতম সুবিধা

সংসদে ১২ আগস্ট পেশ হওয়া কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা ক্যাগের রিপোর্টে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। শুধু পরিষেবার ঘাটতিই নয়, যাত্রী পরিষেবা সংক্রান্ত ৫৯ শতাংশ কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি বলেও অডিটে উঠে এসেছে। বরাদ্দ অর্থও যথেষ্ট পরিমাণে খরচ করা হয়নি। ক্যাগ ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ পর্যন্ত রেলস্টেশনের যাত্রী পরিষেবা নিয়ে অডিট করেছে।

এর আগে ২০১৬ সালে একই ধরনের অডিট হয়েছিল। প্রায় এক দশক পর ফের অডিটে দেখা গেল, আগের রিপোর্টে ঘাটতি দূর করার যে আশ্বাস রেল মন্ত্রকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল, তার পরেও বহু সমস্যা রয়ে গেছে। অর্থাৎ আধুনিকীকরণ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের নানা দাবি থাকলেও যাত্রীদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের মৌলিক পরিষেবার ক্ষেত্রে এখনও বড় ফাঁক রয়েছে।

রেলওয়ে বোর্ড ২০০৩ সালে স্টেশনগুলির জন্য ‘ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পরিষেবা’বা মিনিমাম এসেনশিয়াল অ্যামেনিটিজ  এর মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিল। ২০১৮ সালের এপ্রিলে তা সংশোধন করা হয়। পানীয় জলের কল, বসার ব্যবস্থা, ইউরিনাল, শৌচাগার, অপেক্ষাকক্ষ, ওয়াটার কুলার, পাখা, ঘড়ি, প্ল্যাটফর্ম শেড, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম, পার্কিং ও যাতায়াতের এলাকা এবং ইলেকট্রনিক ট্রেন ইন্ডিকেটর বোর্ড সবই এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত।

এই পরিষেবাগুলি ২০১৮ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে সব স্টেশনে নিশ্চিত করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। দেশের ৫,৯০০-রও বেশি অ-উপনগরীয় রেলস্টেশনের মধ্যে ক্যাগ ৫১২টি স্টেশন পরিদর্শন করে। তার মধ্যে মাত্র ৫৪টি স্টেশনে সমস্ত ন্যূনতম পরিষেবার মানদণ্ড পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ পরিদর্শিত স্টেশনগুলির মাত্র প্রায় ১১ শতাংশই সব কটি মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, এই ঘাটতি শুধু ছোট বা প্রত্যন্ত স্টেশনগুলিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বছরে ৭১০ কোটি টাকারও বেশি আয় এবং কোটি কোটি যাত্রীর যাতায়াত রয়েছে, এমন একাধিক বড় স্টেশনেও পরিষেবার ঘাটতি ধরা পড়েছে। ক্যাগের তালিকায় রয়েছে নয়াদিল্লি, হাওড়া, হজরত নিজামুদ্দিন জংশন, সেকেন্দ্রাবাদ, এমজিআর চেন্নাই সেন্ট্রাল, আহমেদাবাদ, ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাস, কেএসআর বেঙ্গালুরু, সুরাট এবং আনন্দ বিহার টার্মিনাল। অর্থাৎ যাত্রী সংখ্যা ও আয়ের নিরিখে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলিও ন্যূনতম পরিষেবার মানদণ্ড থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।

কোথাও পর্যাপ্ত পানীয় জল নেই, কোথাও আবার অপ্রতুল শৌচাগার—রেলস্টেশনগুলিতে যাত্রী পরিষেবার বেহাল চিত্র উঠে এসেছে ক্যাগের অডিটে। রিপোর্টে একাধিক গুরুতর ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অডিট অনুযায়ী, ১৮৮টি স্টেশনে পর্যাপ্ত সংখ্যক পানীয় জলের কল ছিল না। ২১টি স্টেশনে ছিল না কোনও অপেক্ষাকক্ষই। ১১১টি স্টেশনে নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় কম ইউরিনাল এবং ৫৯টি স্টেশনে পর্যাপ্ত শৌচাগার ছিল না। একইভাবে ৬২টি স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম বা প্ল্যাটফর্ম শেডের আচ্ছাদিত এলাকা নির্ধারিত মানের তুলনায় কম পাওয়া গেছে।

এছাড়াও ৬০টি স্টেশনে ঘড়ি ছিল না, ১২৮টি স্টেশনে নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় কম ওয়াটার কুলার এবং ১৪৯টি স্টেশনে পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের ব্যবস্থা ছিল না। শুধু তাই নয়, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন সুবিধাতেও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি ধরা পড়েছে। ফলে দেশের রেলস্টেশনগুলিতে যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম পরিষেবার বাস্তবায়ন নিয়ে ফের বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে ভারতীয় রেল।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলির একটি হল পানীয় জলের গুণমান। একাধিক স্টেশনে সংগ্রহ করা জলের নমুনায় ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। ফলে স্টেশনে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে যাত্রীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পানীয় জল এবং চিকিৎসা সহায়তা নিয়েও যাত্রীদের অভিযোগ বাড়ছে বলে ক্যাগের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্যাগের রিপোর্ট প্রকাশের পর ১৬ আগস্ট রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রায় ২০ হাজার জায়গায়, যার মধ্যে ওয়াটার কুলারও রয়েছে, ‘ট্যাঙ্ক থেকে কল’পর্যন্ত জল পরিশোধনের ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রেল মন্ত্রকের এক শীর্ষ আধিকারিকের বক্তব্য, এবার থেকে স্টেশনগুলিতে পানীয় জলের গুণমানের নজরদারি রেলওয়ে বোর্ডের স্তর থেকে করা হবে। জল সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। শুধু তাই নয়, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পানীয় জলের গুণমান এবং পরিষেবা উন্নয়নের কাজ কতদূর এগোল, সেই সংক্রান্ত রিপোর্টও পর্যায়ক্রমে প্রকাশ্যে আনার কথা জানানো হয়েছে।

রেলস্টেশনে যাত্রী পরিষেবা নিয়ে এক দশকের ব্যবধানে ফের ক্যাগের অডিট। অথচ সমস্যার তালিকা খুব একটা বদলায়নি। একদিকে আধুনিক রেলস্টেশন, নতুন প্রযুক্তি ও দ্রুতগতির পরিষেবার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বহু স্টেশনে এখনও পর্যাপ্ত পানীয় জল, শৌচাগার, অপেক্ষাকক্ষ কিংবা বসার জায়গার মতো মৌলিক সুবিধাই নিশ্চিত করা যায়নি। ক্যাগের রিপোর্ট তাই শুধু রেলস্টেশনের পরিকাঠামোর খতিয়ান নয়, এটি কোটি কোটি যাত্রীর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও রেলের পরিষেবার মান নিয়ে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। এখন দেখার, রিপোর্টে উঠে আসা ঘাটতি কত দ্রুত মেরামত হয় এবং পরবর্তী অডিটে এই ছবির কতটা পরিবর্তন ঘটে।

Related Posts

দুই বছরের নীরবতার পর পিএম কেয়ার্সের হিসাব প্রকাশ, ৮,৪৫২ কোটি টাকা তহবিলে পড়ে রয়েছে

এক বছরে খরচ মাত্র ৮৭ লক্ষ, অনুদান ও সুদে আয় ১,২০০ কোটির বেশি, স্বচ্ছতা নিয়ে সোচ্চার বিরোধীরা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ দুই বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে পিএম কেয়ার্স…

জনগণনার আগেই এনআরসি-র দাবিতে উত্তাল মণিপুর, দু’দিনের ধর্মঘটে ছাত্র সংগঠন

অবৈধ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত জনগণনা বন্ধের দাবি, ১৯৫১-কে ভিত্তিবর্ষ করার প্রস্তাব, বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে হিংসা ও অস্থিরতার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *