মেঘালয়ে হু-হু করে বাড়তে এইচআইভি পজিটিভ রোগীর সংখ্যা! এইচআইভি সংক্রমণের উদ্বেগজনক চিত্র, ৯,২৪৪ জন আক্রান্ত, ইস্ট খাসি হিলসেই সর্বাধিক আক্রান্ত

গত ১২ আগস্ট শিলংয়ের ঐতিহ্যবাহী লেডি কিন কলেজে রাজ্য সরকারের ইনটেনসিফায়েড আইইসি ক্যাম্পেইন ৩.০-র সূচনা হয়। সেই অনুষ্ঠানে এমএসিএস এর পেশ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে চালানো ব্যাপক গণ-পরীক্ষায় ৫৫৮ জন ব্যক্তির শরীরে এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়কালে পরীক্ষা করানো গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে ৬০ জনের শরীরেও এই ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। তবে স্বাস্থ্য আধিকারিকরা পরিষ্কার জানিয়েছেন, এই ৫৫৮ জনের প্রত্যেকেই সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সংক্রমিত হয়েছেন, এমনটা ভেবে নেওয়া ভুল হবে। এটি মূলত স্বাস্থ্যদপ্তরের ব্যাপক অনুসন্ধান ও পরীক্ষার বাড়তি তৎপরতার ফল, যার মাধ্যমে পূর্বে অচেনা পজিটিভ রোগীদের সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

মেঘালয়ে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বর্তমানে এইচআইভি সংক্রমণের আনুমানিক হার ০.৪০ শতাংশ। আরও একটি আশঙ্কাজনক দিক হলো মা থেকে শিশুর শরীরে এইচআইভি সংক্রমণের বিস্তার। রাজ্যে এর চূড়ান্ত হার দাঁড়িয়েছে ৯.৯৭ শতাংশে। চিকিৎসকদের মতে, প্রতি বছর আনুমানিক ২৮৪ জন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার এমন বিশেষ এবং নিবিড় চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন, যার মাধ্যমে শিশুর শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিগত দেড় দশকের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে পাহাড়ে এই ব্যাধির বাড়বাড়ন্ত আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, রাজ্যে প্রতি বছর গড়ে ৬৮১৯ জন মানুষ নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হন। প্রতি ১,০০০ জন সংক্রমণমুক্ত মানুষের মধ্যে সংক্রমণের হার ০.২০। ২০১০ সালের তথ্যের সাথে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক নতুন সংক্রমণের সংখ্যা রাজ্যে প্রায় ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১০ সালের পর থেকে মহিলাদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধির হার ৮২ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি যুবসমাজের মধ্যে এই সংক্রমণ বেড়েছে প্রায় ৬৪ শতাংশ।

মেঘালয়ে এইচআইভি সংক্রমণের সামগ্রিক চিত্র উদ্বেগের। ২০২৫ সালের অনুমান-প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যে প্রায় ৯,২৪৪ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী রয়েছেন। ১৫–৪৯ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণের হার আনুমানিক ০.৪০ শতাংশ। প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যাচ্ছে, ২০১০ সালের তুলনায় বার্ষিক নতুন এইচআইভি সংক্রমণ প্রায় ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে বছরে গড়ে প্রায় ৬৮১টি নতুন সংক্রমণের অনুমান করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলির একটি হল মহিলা ও তরুণদের মধ্যে সংক্রমণের বৃদ্ধি। ২০১০ সালের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ ৮২ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

একই সময়ে ১৫–২৪ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ বেড়েছে প্রায় ৬৪ শতাংশ। মা থেকে শিশুর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের চূড়ান্ত হার ৯.৯৭ শতাংশ। এর ফলে প্রতি বছর আনুমানিক ২৮৪ জন গর্ভবতী মহিলার বিশেষ চিকিৎসা ও পরিচর্যার প্রয়োজন হচ্ছে। তবে পরিসংখ্যানে একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। মেঘালয়ে এইডস সম্পর্কিত বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা আনুমানিক ৩৩ জন, যেখানে মৃত্যুহার প্রতি ১ লক্ষে ১.০১ জন। ২০১০ সালের তুলনায় এইডস সম্পর্কিত মৃত্যুহার প্রায় ৬১ শতাংশ কমেছে।

মেঘালয়ে এইচআইভি সংক্রমণের সার্বিক চিত্র, এইচআইভি আক্রান্তের আনুমানিক সংখ্যা ৯,২৪৪ জন, প্রাপ্তবয়স্কদের সংক্রমণের হার (১৫–৪৯ বছর) ০.৪০%, বার্ষিক নতুন সংক্রমণ গড়ে ৬৮১ জন, ২০১০ এর তুলনায় নতুন সংক্রমণ  প্রায় ৫৯% বৃদ্ধি, মহিলাদের সংক্রমণ: ২০১০ এর তুলনায় ৮২% এর বেশি বৃদ্ধি, তরুণদের সংক্রমণ (১৫–২৪ বছর) ২০১০ এর তুলনায় প্রায় ৬৪% বৃদ্ধি, মা থেকে শিশুর সংক্রমণের চূড়ান্ত হার ৯.৯৭%, বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন এমন গর্ভবতী মহিলা  বছরে প্রায় ২৮৪ জন, এইডস সম্পর্কিত বার্ষিক মৃত্যু প্রায় ৩৩ জন, মৃত্যুহার প্রতি ১ লক্ষে ১.০১ জন, ২০১০-এর তুলনায় মৃত্যুহার: প্রায় ৬১% হ্রাস পরিসংখ্যান বলছে, চিকিৎসা ও মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হলেও নতুন সংক্রমণ, বিশেষ করে মহিলা ও তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি, এখনও মেঘালয়ের জন্য বড় জনস্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ।

সংক্রমণ বৃদ্ধির উদ্বেগের মাঝেই স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে রাজ্যের চিকিৎসা পরিকাঠামো। দীর্ঘমেয়াদে এইডস-সম্পর্কিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে রাজ্যে প্রতি বছর এইডস-সম্পর্কিত আনুমানিক মৃত্যুর সংখ্যা ৩৩ (প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় মৃত্যুহার ১.০১)। ২০১০ সালের তথ্যের তুলনায় মৃত্যুহার ৬১ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির ব্যাপক বিস্তার, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের সুবিধা এবং আক্রান্তদের নিয়মিত চিকিৎসা বলয়ে ধরে রাখার ফলেই এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মেঘালয় বিধানসভায় পেশ করা এক পরিসংখ্যানে জানানো হয়, গত এক দশকে রাজ্যে এইচআইভি সংক্রান্ত নানা কারণে মোট ৭৪৯ জন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়াইলাডমিকি শ্যিলা অবশ্য স্পষ্ট করেন যে, এইচআইভি সরাসরি এই মৃত্যুর একমাত্র কারণ নয়। বরং প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে শরীরে চেপে বসা অন্যান্য মারাত্মক সুযোগসন্ধানী সংক্রমণ এর ফলেই রোগীদের মৃত্যু হয়েছে।

জেলাভিত্তিক খতিয়ানে দেখা যাচ্ছে, খাসি এবং জয়ন্তিয়া পাহাড়ি জেলাগুলিতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। ইস্ট খাসি হিলস: ৪৩৫ জন, ওয়েস্ট জয়ন্তিয়া হিলস: ১২৩ জন, ইস্ট জয়ন্তিয়া হিলস: ৯০ জন, রি-ভয়: ৫১ জন, ইস্টার্ন ওয়েস্ট খাসি হিলস : ১৬ জন, ওয়েস্ট গারো হিলস: ৯ জন, ওয়েস্ট খাসি হিলস: ৮ জন, সাউথ ওয়েস্ট খাসি হিলস: ৭ জন, ইস্ট গারো হিলস: ৪ জন, সাউথ গারো হিলস: ৩ জন, সাউথ ওয়েস্ট গারো হিলস: ২ জন, নর্থ গারো হিলস: ১ জন, মোট মৃত্যু: ৭৪৯ জন। পরিসংখ্যান স্পষ্ট বলে দেয়, কেবল ইস্ট খাসি হিলস জেলাতেই মোট মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি (৪৩৫ জন) ঘটনা ঘটেছে। এই বৈষম্যের কারণেই রাজ্য সরকার পুরো মেঘালয়ে ঢালাও একই পরিকল্পনা না করে জেলাভিত্তিক পৃথক কৌশল গ্রহণ করছে।

চিকিৎসা শুরুর পর তা মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া বা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নজরদারি থেকে ছিটকে পড়া বর্তমানে প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ। উদাহরণস্বরূপ, ইস্ট খাসি হিলসে ৩,৪৩২ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হলেও নিয়মিত চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন মাত্র ১,৫৮১ জন। উদ্বেগজনকভাবে ৬৮১৮ জন আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, যাঁদের আর অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকদের মতে, প্রাথমিক চিকিৎসায় সাড়া দিয়ে সুস্থ বোধ করলেই অনেকে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছেন। পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক লজ্জা ও বৈষম্যের ভয়। সেই কারণেই দপ্তর থেকে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে, আক্রান্ত এলাকা বা ব্যক্তিদের এমনভাবে প্রকাশ্যে চিহ্নিত না করতে, যাতে সমাজে স্টিগমা বা সামাজিক হেয় প্রতিপন্ন করার মানসিকতা ।

মেঘালয়ের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ২০ বছরের নিচে। ফলে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে বিস্তৃত আইইসি কর্মসূচির ছক কষেছে এমএসিএস ১,০২৬টি গ্রাম-স্তরের উঠোন বৈঠক ও সচেতনতা সভা। ৩,০০০টি স্কুল এবং ৮৫টি কলেজে বিশেষ সচেতনতামূলক অধিবেশন। ৩০টি ফ্ল্যাশ মব এবং ৩০টি লোকসংস্কৃতি ভিত্তিক পরিবেশনা। ১৫,০০০টি পরিবারে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে প্রচার ও তথ্যাদি প্রদান। সরকারি হাসপাতালে ১২টি বিশেষ শিবিরের আয়োজন ও ১০টি মোবাইল প্রচার বুথ স্থাপন।

বর্তমানে রাজ্যের ১১টি জেলা জুড়ে ৪৩৮টি কেন্দ্র থেকে এইচআইভি পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যে ১০,২৯৩ জন আক্রান্ত ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) গ্রহণ করছেন। রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা দিতে কাজ করছে ৫টি এআরটি কেন্দ্র (যার মধ্যে ২টি কেবল ইস্ট খাসি হিলসেই অবস্থিত), ৩৯২টি স্বতন্ত্র আইসিটিসি এবং ৪টি মোবাইল আইসিটিসি ভ্যান।

ভবিষ্যৎ পরিকাঠামো ঢেলে সাজাতে রাজ্য সরকার ইতোমধ্যে ৫ বছর মেয়াদি ২৫ কোটি টাকার মিশন-মোড প্রকল্প অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল এইডস কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য এমএসিএস-কে ১৭.৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। চিকিৎসাব্যবস্থা ও ওষুধ পর্যাপ্ত থাকলেও, ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে শেষ হাসি হাসতে প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। সামাজিক ভয় ও অনীহা কাটিয়ে উঠে সর্বস্তরের মানুষ যদি নির্দ্বিধায় পরীক্ষা করাতে এবং চিকিৎসায় যুক্ত থাকতে এগিয়ে আসেন, তবেই মেঘালয় পারবে এই অমলিন পাহাড়ি উপত্যকাকে এইচআইভি মুক্ত এক নতুন সকাল উপহার দিতে।

Related Posts

বিশ্বগুরু হওয়ার ফাঁপা দাবি! শীর্ষ দুই সংস্থা এনসিইআরটিতে অর্ধেকের বেশি এবং সিবিএসইতে ৪৪% পদ খালি

প্রাথমিকে ৬ কোটি পড়ুয়া থাকলেও উচ্চমাধ্যমিকে পৌঁছানোর আগেই স্কুলছুট ৭৩% শিক্ষার্থী, জাঁতাকলে বিশ্বমানের স্বপ্ন বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ আগষ্টঃ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দুই মূল স্তম্ভ, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ…

গোমূত্রে মিলবে লক্ষ্মী? লিটারপ্রতি ১০ টাকায় সংগ্রহের ধামাকা স্কিম উত্তরপ্রদেশে, রাজনৈতিক চর্চা তুঙ্গে

যোগীরাজ্যে লিটারপ্রতি ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে গোমূত্র! বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ আগষ্টঃ দুধ দেওয়া বন্ধ করে দিলে যে গরুকে এতদিন অনেকে গ্রামীণ অর্থনীতির বোঝা বলে মনে করতেন, সেই গরুই এবার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *