জাল স্বাক্ষরে গায়েব ২ লক্ষ টাকা! কালাইন পিএনবিতে জালিয়াতিকাণ্ড, কাঠগড়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ

ঘটনার সূত্রপাত কাটিগড়া সমষ্টির সৈদপুর গ্রামের বাসিন্দা হরদয়াল দাসের একটি অভিজ্ঞতা থেকে। সম্প্রতি তিনি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কালাইন পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে চেকের মাধ্যমে টাকা তুলতে যান। কিন্তু ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে তিনি যা শুনলেন, তাতে তাঁর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে! ব্যাংককর্মীরা তাঁকে জানান, তাঁর অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা নেই । বিষয়টি বিশ্বাস না হওয়ায় হরদয়ালবাবু ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন।

বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে ইতোমধ্যেই ১ লক্ষ ৯৮ হাজার টাকা একটি চেকের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু হরদয়ালবাবু নিজে এমন কোনো চেক কাউকে দেননি বা টাকা তোলেননি! খবর শুনে স্তম্ভিত হরদয়াল দাস ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে সেই সংশ্লিষ্ট চেকটি দেখতে চান। চেক হাতে পেতেই আসল সত্য সামনে আসে, চেকে থাকা স্বাক্ষরটি তাঁর নয়! জাল স্বাক্ষর করে পুরো টাকাটি হাওয়া করে দেওয়া হয়েছে।

স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি পরিষ্কার হতেই হরদয়াল দাস ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করার দাবি জানান, যাতে অপরাধীকে শনাক্ত করা যায়। কিন্তু অভিযোগ, ব্যাংক ম্যানেজার কোনো অজ্ঞাত কারণে সেই সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে সরাসরি অস্বীকার করেন! নিরুপায় হয়ে সুবিচারের আশায় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কৃষক মোর্চার সভাপতি সুমিত বৈষ্ণবের দ্বারস্থ হন প্রতারিত গ্রাহক। সুমিত বৈষ্ণবের বিশেষ তৎপরতায় স্থানীয় পর্যায়ে শুরু হয় তদন্ত।

প্রযুক্তির সহায়তা ও অনুসন্ধানের পর অবশেষে ধরা পড়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি। পরবর্তীতে একটি গ্রামীণ বিচারসভা ডাকা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সকলের সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করে নেয়। সে জানায়, হরদয়াল দাসের বাড়ি থেকে চেকবইয়ের একটি পাতা কৌশলে চুরি করেছিল সে। এরপর হরদয়ালবাবুর স্বাক্ষর জাল করে অন্য এক ব্যক্তির সহযোগিতায় ব্যাংক থেকে ১ লক্ষ ৯৮ হাজার টাকা তুলে নেয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি ধরা না পড়ত, তবে কি হরদয়াল দাস তাঁর সারাজীবনের জমানো এই টাকা আর কোনোদিন ফেরত পেতেন? ব্যাংক কি তাঁর এই ক্ষতির দায় নিত? ব্যাংকের ভূমিকা ও অসংবেদনশীল মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন এলাকার সচেতন নাগরিক। প্রতারক ধরা পড়লেও এই ঘটনায় মূল অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে কালাইন পিএনবি কর্তৃপক্ষ। রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া এর স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে, যেকোনো বড় অঙ্কের টাকা তোলার ক্ষেত্রে আমানতকারীর মূল স্বাক্ষরের সাথে চেকের স্বাক্ষর নিখুঁতভাবে মেলাতে হবে। প্রয়োজনে গ্রাহকের রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বরে ফোন করে চেক নিশ্চিত করতে হবে।

এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির পর কালাইন পিএনবি-র কার্যপ্রণালী ও সচ্ছলতা নিয়ে তিনটি অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্ন তুলছেন ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ও ওয়াকিবহাল মহল, রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার স্পষ্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, চেকের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের সময় মূল নমুনার সঙ্গে গ্রাহকের স্বাক্ষর মেলাচ্ছেন কি না, তা সুনিশ্চিত করা ক্যাশিয়ারের প্রাথমিক ও বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।

বাস্তব রূপরেখা সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে একজন ক্যাশিয়ার এই তফাত উপেক্ষা করে এত বড় অঙ্কের টাকা ছাড়লেন? ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, বিশাল অঙ্কের অর্থ চেকে তোলা হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রাহকের নথিবদ্ধ মোবাইল নম্বরে একটি ফোন করে নিশ্চিত হওয়া সাধারণ প্রথা। কিন্তু ১ লক্ষ ৯৮ হাজার টাকার মতো মোটা অঙ্কের অর্থ এক অজ্ঞাত ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার পূর্বে গ্রাহককে ফোন করার কোনো প্রয়োজনই বোধ করল না কেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ?

স্বাক্ষরের স্পষ্ট গরমিল এবং চেকের সত্যতা যাচাই না করে দ্রুত টাকা হাতবদল হওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের ভেতরের কোনো কর্মীর ভূমিকা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। তবে কি জালিয়াতি চক্রের সাথে ব্যাংকেরই কোনো অসাধু কর্মচারীর গোপন যোগসাজশ বা আঁতাত ছিল? এই প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। আমানতকারীদের জমানো টাকার নিরাপত্তার স্বার্থেই এই রহস্যের জট ছাড়াতে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো ব্যাংক ম্যানেজারের প্রতিক্রিয়া। আজ বিজেপি কৃষক মোর্চার সভাপতি সুমিত বৈষ্ণব বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক ম্যানেজারের সাথে সরাসরি দেখা করলে, ম্যানেজার অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেন। তিনি নাকি বলেন, দোষী ব্যক্তি তো ধরা পড়ে গেছে, তাহলে এখন আর এসব কথা বলে কী লাভ? ম্যানেজারের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সংবেদনহীন মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুমিত বৈষ্ণব সহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।

সুমিতবাবু তোপ দেগে বলেন, ব্যাংক ম্যানেজারের এই উত্তর প্রমাণ করে যে গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথাই নেই। অপরাধী ধরা না পড়লে ওই সাধারণ গ্রাহকের টাকা কি ব্যাংক ফিরিয়ে দিত? কালাইন পিএনবি-র এই চরম গাফিলতি ও সুরক্ষার দৈন্যদশা নিয়ে এখন সরগরম পুরো অঞ্চল। ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ এবং জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

সুমিত বৈষ্ণব এবং কালাইনের ক্ষুব্ধ জনগণ একযোগে দাবি জানিয়েছেন, যে বা যেসকল ব্যাংককর্মী স্বাক্ষর যাচাই না করে টাকা হস্তান্তর করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। কালাইন পিএনবি শাখার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অবিলম্বে জোরদার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নিরীহ গ্রাহককে এমন প্রতারণার শিকার হতে না হয়। পুরো ঘটনার পেছনে কোনো অসাধু চক্র সক্রিয় কিনা, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রয়োজন।

কালাইন পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড সাধারণ আমানতকারীদের মনে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। ব্যাংকের মতো একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানেও যদি গ্রাহকের কষ্টার্জিত অর্থ সুরক্ষিত না থাকে, তবে মানুষ কোথায় যাবে? এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বস্তরে।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভের সাথে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যদি অনতিবিলম্বে নিজেদের ভুল শুধরে না নেয় এবং দোষী কর্মীদের কঠোর শাস্তির আওতায় না আনে, তবে আগামী দিনে ব্যাংকের সমুখভাগে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে সমস্ত কাজকর্ম। সুবিচার ও আমানতের সুরক্ষার দাবিতে কালাইনের সাধারণ জনগণ ও সর্বস্তরের মানুষ একত্রে রাজপথে নেমে বৃহত্তর গণআন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।

Related Posts

আইনকে বুড়ো আঙুল! দিলখুশ চা বাগানে পূর্ত বিভাগের বেপরোয়া তাণ্ডব, আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন অনিল গোয়েঙ্কা

অনুমতি ছাড়াই বুলডোজার চালিয়ে লক্ষাধিক চা গাছ ও পাহাড় ধ্বংস, আলোচনার আশ্বাস দিয়েও নিরুদ্দেশ এসডিও! বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ আগষ্টঃ সরকারি উন্নয়নমূলক কাজের দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন চা বাগান ধ্বংসের…

মেঘালয়ে হু-হু করে বাড়তে এইচআইভি পজিটিভ রোগীর সংখ্যা! এইচআইভি সংক্রমণের উদ্বেগজনক চিত্র, ৯,২৪৪ জন আক্রান্ত, ইস্ট খাসি হিলসেই সর্বাধিক আক্রান্ত

এক দশকে ৫৯% সংক্রমণ বৃদ্ধি, পাহাড়ি রাজ্যে এইচআইভি প্রতিরোধ কি শুধুই কাগজ-কলমে? বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ আগষ্টঃ একদিকে চিকিৎসাব্যবস্থার অগ্রগতি এবং এইডস সম্পর্কিত মৃত্যুতে ধারাবাহিক পতন, অন্যদিকে নারী ও তরুণ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *