প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবি তুলে কংগ্রেস দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করছে: সঞ্জীব বণিক
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩০ সেপ্টেম্বরঃ নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী কংগ্রেস ও শাসকদল বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর ফের তীব্র হয়ে উঠেছে। ভোটে পরাজয়ের পর ইভিএম, ভোটার তালিকা কিংবা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগ এনে কংগ্রেসকে নিশানা করল শ্রীভূমি জেলা বিজেপি নেতৃত্ব। একই সঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের অবস্থান নিয়েও সরব হন বিজেপি নেতারা।
মঙ্গলবার শ্রীভূমি জেলা বিজেপি কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে জেলা বিজেপি সভাপতি সঞ্জীব বণিক, রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ মিশন রঞ্জন দাস, পুরপতি রবীন্দ্র চন্দ্র দেব, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অনিল কুমার ত্রিপাঠী, ভাইস চেয়ারম্যান সাথী রায় কুরি, আইনজীবী বিপ্লব দেব, সাধারণ সম্পাদক দিলীপ দাস, মিডিয়া ইনচার্জ পাপ্পু কুরি-সহ দলের অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকার সংশোধন, SIR এবং EVM-VVPAT নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে বিজেপির অবস্থান তুলে ধরা হয়।
জেলা বিজেপি সভাপতি সঞ্জীব বণিকের অভিযোগ, নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পেলেই কংগ্রেস ও বিরোধী দলগুলি নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাঁর বক্তব্য, অতীতে EVM ও VVPAT নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, এবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবি তুলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বর্তমানে জাতীয় স্তরেও যথেষ্ট তীব্র। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ CEC জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি তুলেছেন এবং SIR-সহ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক দাবি জানিয়েছেন।
‘নির্বাচন কমিশনের কাজ প্রশংসনীয়’, সঞ্জীব বণিক
সঞ্জীব বণিক বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে নির্বাচন কমিশন। তাঁর দাবি, বিশেষ করে বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনের উদ্যোগের মাধ্যমে প্রকৃত ভোটারদের নিয়ে আরও স্বচ্ছ তালিকা তৈরির চেষ্টা চলছে। SIR-এর মতো প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি থাকলেও বিজেপির দৃষ্টিতে ভোটার তালিকার শুদ্ধতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জেলা বিজেপি সভাপতির বক্তব্য, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন যে কাজ করছে, তার জন্য শ্রীভূমি জেলা বিজেপির পক্ষ থেকে তাঁকে ধন্যবাদ জানানো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমার ১৫ মার্চ ২০২৪-এ নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ ভারতের ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কমিশনের বর্তমান কাঠামোয় তাঁর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে রয়েছেন সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী।
‘জ্ঞানেশ কুমার কতগুলি লোকসভা নির্বাচন পেয়েছেন?’ মিশন রঞ্জন দাস
সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ মিশন রঞ্জন দাস পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে জ্ঞানেশ কুমার কতগুলি লোকসভা নির্বাচন পরিচালনা করেছেন? তাঁর বক্তব্য, জ্ঞানেশ কুমার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব নেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন-সহ একাধিক নির্বাচন পরিচালনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন তাঁর CEC হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের তথ্যেও বলা হয়েছে, তিনি ১৫ মার্চ ২০২৪ থেকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেই সময়ে ১৮তম লোকসভা নির্বাচন-সহ জম্মু ও কাশ্মীর, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড ও দিল্লির বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
মিশন রঞ্জন দাস আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ফলকে সামনে রেখে জ্ঞানেশ কুমার বিজেপিকে জেতাতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন, বিরোধীদের এমন অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব পরিসংখ্যানের সামঞ্জস্য নেই। তাঁর যুক্তি, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ৩০৩টি আসন পেয়েছিল, যেখানে ২০২৪ সালে দলটির আসনসংখ্যা কমে ২৪০-এ দাঁড়ায়, অর্থাৎ ৬৩টি আসনের হ্রাস। ২০১৯ সালের ৩০৩ আসনের সরকারি তথ্য নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যানেও রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “বিজেপি কাজে বিশ্বাস করে এবং মানুষের জন্য কাজ করেই ভোট আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিরোধীদের অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে খণ্ডন করার চেষ্টা করেন তিনি।
EVM-VVPAT প্রসঙ্গেও কংগ্রেসকে আক্রমণ
আইনজীবী বিপ্লব দেব সাংবাদিক বৈঠকে EVM ও VVPAT প্রসঙ্গ সামনে এনে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, অতীতেও EVM ও VVPAT নিয়ে একাধিক অভিযোগ করা হলেও সেগুলি আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। এখানে উল্লেখযোগ্য, ২০২৪ সালের ২৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের EVM-VVPAT মামলার রায়ে ১০০ শতাংশ VVPAT গণনার দাবি গ্রহণ করা হয়নি। আদালত প্রতি বিধানসভা কেন্দ্র বা সংসদীয় আসনের বিধানসভা সেগমেন্টে পাঁচটি নির্বাচিত EVM-এর VVPAT পেপার ট্রেল যাচাইয়ের ব্যবস্থা বহাল রাখে। একই রায়ে আদালত উল্লেখ করে যে EVM ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দল ও অন্য পক্ষের আপত্তি ও মামলা হয়েছে এবং আদালত সেগুলির বিষয়ে পূর্বেও রায় দিয়েছে।
অতএব, EVM নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও “কোনও অভিযোগের সত্যতা কখনও প্রমাণিত হয়নি” এই বক্তব্যটি বিজেপি নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে উদ্ধৃত করাই প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে অধিক যথাযথ। এদিকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলি SIR এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে CEC-এর বিরুদ্ধে সংসদে অপসারণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে।
এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, CEC-কে অপসারণের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর। প্রকাশিত সাংবিধানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতোই বিশেষ সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণ করা যায় এবং এর জন্য দুই কক্ষেই নির্ধারিত বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন তার কাজকে সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে CEC-কে কেন্দ্র করে বর্তমান সংঘাত শুধুমাত্র কোনও একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ নয়; এর সঙ্গে ভোটার তালিকা, SIR, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলির আস্থার প্রশ্নও জড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমান বিতর্কের মূল জায়গায় রয়েছে দুটি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলি ভোটার তালিকা সংশোধন ও SIR প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, প্রকৃত ভোটারদের স্বার্থে ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধন প্রয়োজন এবং বিরোধীরা রাজনৈতিক কারণে নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে কংগ্রেস পাঁচ দফা দাবিও সামনে এনেছে, যার মধ্যে বাদ পড়া ভোটারদের তথ্য দেওয়া এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে।
এই অবস্থায় শ্রীভূমি জেলা বিজেপির সাংবাদিক বৈঠক স্থানীয় রাজনীতিতেও জাতীয় স্তরের এই বিতর্কের প্রতিফলন ঘটাল। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্যে যেমন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের দাবি উঠেছে, তেমনই বিরোধী শিবিরের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা।
‘বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ’, বিপ্লব দেবের অভিযোগ
সাংবাদিক বৈঠকে আইনজীবী বিপ্লব দেব আরও অভিযোগ করেন, কংগ্রেস নেতারা দেশের বাইরে গিয়ে নির্বাচন কমিশন, CAG এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন এবং এর মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন। নির্বাচন ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিদেশের মাটিতে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তাঁর অভিযোগ, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতবিরোধকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়েছে। তবে এই বক্তব্যও বিজেপি নেতার রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে; এর সত্যতা বা প্রভাব সম্পর্কে স্বাধীনভাবে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও প্রমাণ পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে শ্রীভূমি জেলা বিজেপির সাংবাদিক সম্মেলন থেকে স্পষ্ট, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, EVM-VVPAT, SIR এবং ভোটার তালিকা এই চারটি বিষয় আগামী দিনেও শাসক ও বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক সংঘাতের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে থাকছে। একদিকে বিজেপি নেতৃত্ব নির্বাচন কমিশনের কাজের পক্ষে সওয়াল করছে, অন্যদিকে কংগ্রেস ও বিরোধী দলগুলি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ফলে রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে প্রকৃত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন কতটা স্বচ্ছ, আপত্তি জানানোর সুযোগ কতটা কার্যকর এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সাধারণ ভোটারের আস্থা কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়।চাইলে এটিকে আমি আরও ধারালো দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতার রিপোর্টের ফরম্যাটে ৩টি শক্তিশালী শিরোনাম, সাবহেডিং, বক্স-আইটেম ও ৮০০–১০০০ শব্দের নিউজ কপি হিসেবেও সাজিয়ে দিতে পারি।





