গুমড়ায় ধৃত মদ ব্যবসায়ীদের বিস্ফোরক বয়ান, ওয়াইন শপে টাকা জমা দিয়েই চলত পুলিশের ম্যানেজ ফর্মুলা!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩০ সেপ্টেম্বরঃ দোরগোড়ায় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা। উৎসবকে ঘিরে যখন কাটিগড়া জুড়ে আনন্দের প্রস্তুতি তুঙ্গে, ঠিক তখনই সমগ্র এলাকায় অবৈধ মদের রমরমা ব্যবসা নিয়ে নতুন করে উঠতে শুরু করেছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, কাটিগড়ার গ্যামন সেতু থেকে মালি ডহর পর্যন্ত বিভিন্ন লাইন হোটেল ও তার আশপাশে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধভাবে বিদেশি মদ বিক্রির কারবার চলছে। শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থান নয়, সমষ্টির বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলেও অনুমোদনহীনভাবে মদ বিক্রির অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রকাশ্যে বা কার্যত ‘খোলা রহস্যের’ মতো চলা এই ব্যবসার বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এতদিন ধরে প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে কীভাবে এই কারবার চলতে পারে?
আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে সম্প্রতি গুমড়া পুলিশের অভিযানে আটক দুই ব্যক্তির বক্তব্যকে ঘিরে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, আবগারি বিভাগের এক কর্মীর মাধ্যমে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করে অবৈধ মদের ব্যবসা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট আবগারি কর্মী বা বিভাগের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অভিযানে ধরা পড়ল দুইজন, সামনে এল বিস্ফোরক অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর জালালপুর এলাকায় অবৈধ মদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় গুমড়া পুলিশ। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মদ বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি মদ বিক্রির অভিযোগে বাপ্পাজিৎ দে এবং জয় কুমার বৈষ্ণব নামে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
অভিযোগ, জিজ্ঞাসাবাদের সময় আটক ব্যক্তিদের বক্তব্যে অবৈধ মদের ব্যবসার আড়ালে টাকা লেনদেন এবং আবগারি বিভাগের এক কর্মীর নাম উঠে আসে। বাপ্পাজিৎ দে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তিনি প্রায় ছয়-সাত বছর ধরে অবৈধ মদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবসা শুরু করার পর থেকে ‘দিবাকর গোয়ালা’ নামে আবগারি বিভাগের এক কর্মী নিয়মিতভাবে মদ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতেন।
বাপ্পাজিৎ দে আরও দাবি করেন, কয়েক মাস সরাসরি টাকা নেওয়ার পর ওই কর্মীর তরফে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়, সরাসরি টাকা না দিয়ে কালাইনের কোনও একটি ওয়াইন শপে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রেখে যেতে। পরে আবগারি বিভাগের কর্মীরা সেই টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে যাবেন বলে জানানো হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি। শুধু তাই নয়, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একই ওয়াইন শপে প্রতিমাসে টাকা জমা দেওয়া হতো না।
পরিস্থিতি অনুযায়ী একেক সময় একেকটি ওয়াইন শপে টাকা রেখে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো। টাকা জমা দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ কে নিয়ে যেতেন, সে বিষয়ে তাঁরা জানতেন না বলেও সাংবাদিকদের জানান তিনি। এই অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আটক অপর ব্যক্তি জয় কুমার বৈষ্ণবও একই ধরনের অভিযোগের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
‘চার-পাঁচ বছর ধরে টাকা’: অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন আরও গুরুতর
আটক ব্যক্তির বক্তব্যে যদি সত্যিই চার-পাঁচ বছর ধরে এ ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠে থাকে, তাহলে বিষয়টি নিছক বেআইনি মদ বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে কারা জড়িত, টাকা কোথা থেকে আসত, কার কাছে যেত, কোন কোন মাধ্যমে লেনদেন হতো এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারী বা অন্য কোনও ব্যক্তি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার। কারণ একজন আটক ব্যক্তির বক্তব্য নিজেই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। অভিযোগ সত্য কি না, তা নথি, আর্থিক লেনদেন, ফোন যোগাযোগ, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করেই নির্ধারণ করতে হবে।
অভিযান হয়, গ্রেপ্তার হয়, তারপর? স্থানীয়দের প্রশ্ন এখানেই। একটি এলাকায় অবৈধ মদের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মদ বাজেয়াপ্ত করছে, ব্যবসার অভিযোগে ব্যক্তিকে আটক করছে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই যদি একই এলাকায় ফের আগের মতো অবৈধ বিক্রি শুরু হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, অভিযান কি কেবল সাময়িক? স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, জালালপুরে পুলিশের অভিযানের পরও কাটিগড়ার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ মদের ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং কোথাও কোথাও ফের আগের মতোই বিক্রি চলছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
তাঁদের বক্তব্য, শুধু কয়েকজন বিক্রেতাকে ধরে মামলা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এই ব্যবসার পেছনে থাকা সরবরাহকারী, অর্থের উৎস, মদ কোথা থেকে আসছে, কারা পরিবহণ করছে এবং কারা নিয়মিতভাবে এই ব্যবসাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, সব দিক খতিয়ে দেখা দরকার। গ্যামন সেতু থেকে মালি ডহর পর্যন্ত বিভিন্ন লাইন হোটেলকে ঘিরে অবৈধ মদ বিক্রির অভিযোগ বহুদিনের বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যেই মদের বেচাকেনা চলে। আবার গ্রামাঞ্চলের কিছু এলাকায় ছোট দোকান বা বাড়িঘরকে কেন্দ্র করেও গোপনে বিক্রি চলছে বলে অভিযোগ উঠছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, যদি সাধারণ মানুষ এসব কর্মকাণ্ড দেখতে পান, তাহলে নিয়মিত নজরদারি থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট দফতর ও পুলিশের চোখে তা পড়ছে না কেন? আটক ব্যক্তিদের বক্তব্যে আবগারি বিভাগের এক কর্মীর নাম ওঠার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ অভিযোগটি সত্য হলে সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার অভিযোগটি মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
তাই স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি কোনওভাবেই চাপা না দিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। অভিযুক্ত কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক। একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে কাটিগড়া সমষ্টিতে অবৈধ মদের বিরুদ্ধে কতগুলি অভিযান হয়েছে, কত পরিমাণ মদ বাজেয়াপ্ত হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার বা আটক হয়েছেন, কতগুলি মামলা হয়েছে এবং মামলাগুলির বর্তমান অবস্থাই বা কী, সেসব তথ্যও প্রকাশ্যে আনার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের একাংশের ক্ষোভ, বছরের পর বছর ধরে যদি অবৈধ মদের ব্যবসা চলতে থাকে এবং একাধিকবার পুলিশি অভিযানের পরও তা ফের মাথাচাড়া দেয়, তাহলে কোথাও না কোথাও নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। তবে প্রশাসন বা আবগারি বিভাগের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘প্রশ্রয়’ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের উচিত অভিযোগগুলি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আনা।
দুর্গাপূজা সামনে। এই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় মানুষের চলাচল বাড়ে, রাত পর্যন্ত বাজার-হাট ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড চলে। অবৈধ মদ সহজলভ্য হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পারিবারিক অশান্তি, দুর্ঘটনা এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। স্থানীয়দের দাবি, উৎসবের মরসুমকে সামনে রেখে কাটিগড়ার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালানো হোক। লাইন হোটেল, অবৈধ বিক্রয়কেন্দ্র এবং সন্দেহজনক মজুতস্থলে নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি বড় সরবরাহ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
প্রশ্ন একটাই, কার ছত্রছায়ায় চলছে কারবার?
গুমড়া পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানের পর আটক ব্যক্তিদের বক্তব্যে যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা নিছক একটি মামলার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের পেছনে যদি কোনও সংগঠিত চক্র থাকে, তাহলে তার শিকড় কোথায়, সেটিও খুঁজে দেখা দরকার। আর যদি আবগারি বিভাগের কোনও কর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কোনও ভিত্তি না থাকে, তাহলেও দ্রুত তদন্ত করে সেই বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রশাসনেরই দায়িত্ব।
কাটিগড়ার মানুষ তাই জানতে চাইছেন,
অবৈধ মদের ব্যবসা বন্ধে প্রশাসনের প্রকৃত পরিকল্পনা কী? দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না? আটক ব্যক্তিদের বক্তব্যে ওঠা ‘টাকা লেনদেন’-এর অভিযোগের তদন্ত হয়েছে কি? অভিযোগে নাম আসা সরকারি কর্মীর ভূমিকা কী? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলির নজরদারির মধ্যেই যদি বছরের পর বছর এই কারবার চলে, তাহলে এর দায় নেবে কে? স্থানীয়দের দাবি, এবার শুধু অভিযান নয়, অবৈধ মদের গোটা নেটওয়ার্কের উৎস থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ্যে আনা হোক। দুর্গাপূজার আগে কাটিগড়াকে অবৈধ মদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত করতে পুলিশ ও আবগারি প্রশাসনের কার্যকর, দৃশ্যমান এবং জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপই এখন প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।





