১০ বছরে বনভূমি বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি প্রায় ৯৮%, সিএজি-র বিস্ফোরক রিপোর্ট
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ আগষ্টঃ জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে আর পরিবেশ সুরক্ষার বিজ্ঞাপনে যে প্রকল্পের নাম ঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হয়েছিল, তার ভেতরের কঙ্কালসার রূপটি অবশেষে প্রকাণ্ডভাবে উন্মোচিত হলো। রাষ্ট্রীয় তহবিল, উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা এবং একের পর এক ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু করা উদ্যোগ—সবই যেন শেষমেশ কাগজের বাঘ হয়েই রয়ে গেল।
পরিবেশ মন্ত্রকের ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ ‘গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন’ গত এক দশকে ভারতের বনভূমি বৃদ্ধিতে কতটা দিশাহীন ও ব্যর্থ, দেশের নিয়ন্ত্রক ও মহাহিসাব নিরীক্ষক বা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ) এর সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টে তা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা সেই পরিসংখ্যান দেখলে যেকোনো পরিবেশ সচেতন নাগরিক শিউরে উঠবেন।
২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনার (এনএপিসিসি) অধীনে চালু হয়েছিল গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন। লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত মহৎ এবং দৃষ্টিনন্দন দেশের বনভূমি সংরক্ষণ, ধ্বংসপ্রাপ্ত বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার এবং বনাঞ্চলের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত গত ১০ বছরের খতিয়ান মেলাতে গিয়ে সিএজি যে হিসেব তুলে ধরেছে, তা নজিরবিহীন ব্যর্থতার সাক্ষ্য বহন করে, গত এক দশকে দেশে অতিরিক্ত ১৪ লক্ষ হেক্টর বনভূমি বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হলেও বাস্তবে বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৩০ হাজার হেক্টর!
অর্থাৎ, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য ৯৭.৫ শতাংশ। শুধু নতুন বন তৈরিই নয়, বিদ্যমান বনাঞ্চলের গুণগত মান উন্নয়নের ক্ষেত্রটিতেও ধরা পড়েছে চরম উদাসীনতা। ১৪ লক্ষ হেক্টর বনভূমির গুণগত মান সুসংহত করার স্বপ্ন দেখানো হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ১ লক্ষ হেক্টরে। এক্ষেত্রে ব্যর্থতা ও ঘাটতির হার ৯১.৮ শতাংশ।
১৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে চালানো এই বিস্তৃত অডিট রিপোর্টে সিএজি সুস্পষ্টভাবে আঙুল তুলেছে পরিবেশ মন্ত্রক ও প্রশাসন ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা গলদের দিকে। প্রকল্পের শুরু থেকেই ছিল না কোনো সঠিক বাজেট বণ্টন ও অর্থ ব্যবহারের সুষ্ঠু দূরদর্শিতা। খামখেয়ালি বরাদ্দের কারণে বাস্তবায়ন থমকে গেছে বারংবার। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরে ইতিমধ্যে চালু থাকা পরিবেশ ও বন সংক্রান্ত অন্যান্য প্রকল্পগুলোর সাথে গ্রিন ইন্ডিয়া মিশনের কোনো কার্যকর মেলবন্ধন বা সমন্বয় স্থাপন করা হয়নি।
ফলে একে অপরের পরিপূরক হওয়ার বদলে প্রকল্পটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো অকেজো হয়ে পড়ে রইল। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি যাচাইয়ের জন্য কোনো শক্তপোক্ত নজরদারি বা ফিল্ড মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি।মিশনের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল বায়ুমণ্ডলের কার্বন শোষণ মাপাই করা। অথচ বিগত এক দশকে দেশের মাত্র দুটি রাজ্য মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড় এই কার্বন শোষণের পরিমাণ নির্ধারণের সামান্য সদিচ্ছা দেখিয়েছে। বাকি রাজ্যগুলোতে এর কোনো নামগন্ধই নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক সংকট যখন আজ ঠিক আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে এবং বিশ্বমঞ্চে ভারত যখন সবুজ ভবিষ্যতের একাধিক বড় বড় প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দেশের শীর্ষ অডিট সংস্থা (ক্যাগ)র সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ আমলাতন্ত্রের চরম অপেশাদারিত্ব ও প্রশাসনিক স্থবিরতাকেই একপ্রকার নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সরকারি খাতায় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেখিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার যে রঙিন নাটক দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা মূলত সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থেরই অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
কাগজে-কলমে হাজার হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা ও বড় বড় লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তুত করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রকৃত রূপায়ণ প্রায় শূন্যের কোঠায়। পরিবেশ রক্ষা এবং বনাঞ্চল বৃদ্ধির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্পষ্ট কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি। নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন না করেই প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বাজেট মঞ্জুর ও খরচ দেখানো হলেও, ফল হিসেবে সাধারণ নাগরিক পাচ্ছেন কেবল প্রশাসনিক স্থবিরতা। বিশ্বমঞ্চে পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রার যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, সিএজি-র অডিটে ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা তার ঠিক বিপরীত এক নৈরাশ্যের ছবি তুলে ধরছে।
সরকার ও প্রশাসন কি এই চাঞ্চল্যকর সিএজি (ক্যাগ) রিপোর্ট থেকে সঠিক শিক্ষা নিয়ে অসাধু ও অযোগ্য কর্মকর্তাদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনবে, নাকি প্রতিশ্রুতির এই ‘সবুজ ফাঁকি’ আগের মতোই প্রশাসনিক ফাইলের আড়ালে ধামাচাপা পড়ে থাকবে? পরিবেশ রক্ষায় আন্তরিক সদিচ্ছা না থাকলে যে কোটি কোটি টাকার এই জাতীয় মিশনগুলো স্রেফ বিজ্ঞাপনী ফাঁকা বুলি হয়েই রয়, শীর্ষ অডিট সংস্থার বিস্ফোরক খতিয়ানে তা আজ নগ্নভাবে প্রমাণিত।
অডিট রিপোর্টে স্পষ্ট হওয়া নীতিগত বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অনিয়মের পর সংশ্লিষ্ট অসৎ বা অযোগ্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। অতীতেও একাধিক নজরদারি রিপোর্টে সরকারি প্রকল্পের গলদ ধরা পড়ার পর সাময়িক হইচই হলেও তা কালক্রমে ধামাচাপা পড়ে গেছে। এবারও কি সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে স্রেফ নতুন প্রকল্প ঘোষণা আর বাজেটের পরিসংখ্যান দেখানোই যথেষ্ট নয়; মূল প্রয়োজন নিবিড় মাঠপর্যায়ের কাজ এবং স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ। কোটি কোটি টাকার করদাতাদের অর্থ অপচয়ের পরও যদি প্রশাসনিক স্তরে কারো দায় নির্দিষ্ট না হয়, তবে ভবিষ্যতে পরিবেশ রক্ষার যেকোনো নতুন উদ্যোগও একই রকম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
জলবায়ু সংকটের মতো চরম বাস্তবিক বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক গাফিলতি কেবল অনিয়মই নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সাথে এক বিপজ্জনক ছিনিমিনি খেলা। অবিলম্বে এই প্রশাসনিক দায়বদ্ধতাহীনতার অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত জবাবদিহি সুনিশ্চিত করা না হলে পরিবেশ সুরক্ষার এই পরিকল্পনাগুলো চিরকাল বিজ্ঞাপনী স্লোগান হিসেবেই থেকে যাবে।





