নেতা-আমলাদের গাড়ির সাইরেনেই শেষ চিকিৎসা? পরিদর্শনের নামে বড় বড় কথা, কাজের বেলায় অশ্বডিম্ব!

লক্ষাধিক মানুষের একমাত্র নির্ভরতার কেন্দ্র কাটিগড়া এম.জি. মডেল হাসপাতাল আজ কার্যত একটি পঙ্গু স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আধুনিক অবকাঠামোর চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, অপর্যাপ্ত পরিষেবা এবং অব্যবস্থাপনার এক গভীর খাদ। ফলে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে সঠিক চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে ছুটে আসা সাধারণ মানুষকে হতাশা, ক্ষোভ এবং চরম দুর্ভোগ বুকে নিয়েই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।

অভিযোগের পাহাড় জমলেও কাটিগড়া এম.জি. মডেল হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিষেবায় আজও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন নেই। আধুনিক ভবন থাকলেও চিকিৎসা ব্যবস্থার ভিত কার্যত ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালে নেই সিনিয়র মেডিকেল অফিসার, নেই রেডিওলজিস্ট, নেই সোনোলজিস্ট, এমনকি সাধারণ রোগীদের ন্যূনতম চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক জেনারেল মেডিকেল অফিসারও নেই।

দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য পড়ে থাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিন কাটিগড়া ও আশপাশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল থেকে চিকিৎসার আশায় আসা শত শত রোগী ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবাও পাচ্ছেন না। ফলে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে সঠিক চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে ছুটে আসা সাধারণ মানুষকে হতাশা, ক্ষোভ এবং চরম দুর্ভোগ বুকে নিয়েই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।

কাটিগড়ার বিধায়ক পদাধিকারবলে এই হাসপাতাল পরিচালন সমিতির চেয়ারম্যান। স্বাভাবিকভাবেই নতুন নেতৃত্বের কাছে এলাকার মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা কাটিয়ে হাসপাতালটি নতুন গতি পাবে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর শূন্যপদ পূরণ হবে এবং সাধারণ মানুষ উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবেন। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এখনো পর্যন্ত হাসপাতালের মৌলিক সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সাধারণ মানুষের হতাশা ও ক্ষোভ দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

এই চরম অব্যবস্থার মাঝেই বৃহস্পতিবার কাছাড়ের জেলা আয়ুক্ত রাহুল কুমার গুপ্ত হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। আয়ুক্তের সঙ্গে ছিলেন কাটিগড়ার চক্র আধিকারিক (সার্কেল অফিসার) যাত্রা কান্ত কর্মকার, স্বাস্থ্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম সঞ্চালক শিবানন্দ রায়, হাসপাতালের সুপারিন্টেনডেন্ট ডা. মনজুরুল হক এবং পূর্ত বিভাগের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার কল্লুল বরণ নাথ সহ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের একঝাঁক শীর্ষ কর্মকর্তা।

জেলা আয়ুক্ত হাসপাতালের ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ, ডায়ালসিস ইউনিট, প্রসূতি ও জরুরি বিভাগ ঘুর ঘুরে দেখলেন, কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সাথে পরিদর্শনের প্রথাগত আলোচনাও করলেন। কিন্তু স্থানীয়দের সরাসরি অভিযোগ, যে মূল সমস্যা হাসপাতালটিকে পঙ্গু করে রেখেছে, অর্থাৎ দীর্ঘদিনের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের ব্যাপারে কোনো জোরালো বা সদর্থক আশ্বাসই মেলেনি আয়ুক্তের পরিদর্শনে। এটি যেন শুধুই আরেকটি রুটিন পরিদর্শনের ‘আইওয়াশ’ ছাড়া আর কিছুই নয়!

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে কাটিগড়া এম.জি. মডেল হাসপাতালের প্রসূতি পরিষেবায়। দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে হাসপাতালে কোনো সোনোলজিস্ট বা রেডিওলজিস্ট না থাকায় গর্ভবতী মহিলাদের প্রয়োজনীয় সনোগ্রাফি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কাটিগড়া ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার অসংখ্য অন্তঃসত্ত্বা মহিলা এবং তাঁদের পরিবারের ওপর।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি মাসে গড়ে শতাধিক গর্ভবতী মহিলারা বাধ্য হয়ে জরুরি সনোগ্রাফি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে শিলচরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্বারস্থ হচ্ছেন। চিকিৎসার পাশাপাশি যাতায়াতের খরচ, গাড়ি ভাড়া এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উচ্চ ব্যয় বহন করতে গিয়ে বহু দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ছে।

অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক অন্তঃসত্ত্বা মহিলারা নির্ধারিত সময়ে এই অত্যাবশ্যকীয় পরীক্ষা করাতে পারছেন না। চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থায় সময়মতো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না হলে মা ও গর্ভস্থ শিশুর সম্ভাব্য জটিলতা শনাক্ত করতে বিলম্ব হতে পারে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে একটি মডেল হাসপাতালের এমন মৌলিক পরিষেবার দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনছে না, বরং এলাকার হাজার হাজার পরিবারের উদ্বেগ ও দুর্ভোগও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে।

শুধু গর্ভবতী মহিলারাই নন, সাধারণ দুর্ঘটনা বা অন্যান্য জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত অসংখ্য রোগীদের আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ জরুরি পরীক্ষার জন্য যেতে হচ্ছে হাসপাতালের বাইরে। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে ধার দেনা করে আসা রোগীরা মাঝপথেই চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই কঙ্কালসার চেহারার দরুন সাধারণ মানুষের সুস্থ জীবনের স্বপ্ন আজ তামাশায় পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের একটাই ক্ষুব্ধ প্রশ্ন, জনগণের কোটি কোটি টাকা করের টাকায় যদি একটি তথাকথিত ‘মডেল’ হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়, আর সেখানে প্রয়োজনীয় ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে মৌলিক চিকিৎসাটুকুই না মেলে, তবে এই বিশাল ইট-পাথরের কাঠামোর উপযোগিতা কোথায়? শুধু পরিদর্শনের ছবি তুলে ফিতা কাটার রাজনীতি আর কতদিন চলবে? কাটিগড়াবাসী আর কোনো প্রতিশ্রুতি বা ফটো-সেশন চান না, তাঁরা চান অবিলম্বে সমস্ত শূন্য পদে স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ এবং আধুনিক ডায়াগনস্টিক পরিষেবার দ্রুত চালু।

জেলা প্রশাসনের এই হাই-প্রোফাইল পরিদর্শনের পর সত্যিই কি কাটিগড়া এম.জি. মডেল হাসপাতালের দীর্ঘদিনের দূরবস্থা মিটবে? নাকি বরাবরের মতোই সমস্ত ফাইল, আশ্বাস আর প্রশাসনিক বৈঠক কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে? এই প্রশ্নই এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কাটিগড়ার লক্ষাধিক ক্ষুব্ধ ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষকে।

Related Posts

তুঘলক ক্রিসেন্টের বাংলোয় সেই রাতের পোড়া নোটের রহস্য, তদন্তে কাঠগড়ায় বিচারপতি বর্মা

অগ্নিকাণ্ডের পর মিলেছিল বিপুল নগদ, পরে রহস্যজনকভাবে উধাও; তিন অভিযোগই সত্য বলে জানাল তদন্ত কমিটি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ বাইরে থেকে দেখলে দিল্লির তুঘলক ক্রিসেন্টের ৩০ নম্বর সরকারি…

সাবান-বিস্কুটেও মূল্যবৃদ্ধির আঁচ, সেপ্টেম্বরে আরও চাপে মধ্যবিত্তের সংসার

কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচের অজুহাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তুতিতে একাধিক এফএমসিজি সংস্থা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ রান্নাঘরের গ্যাস থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধিতে এমনিতেই চাপে সাধারণ মানুষের সংসার। এর…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *