একজনকে বাঁচাতে গিয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে একে একে নিভে গেল ৪টি তাজা প্রাণ, বাড়ির মালিক আটক, এলাকা জুড়ে শোকের ছায়া
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১আগষ্ট, ২০২৬: নিরাপত্তা সরঞ্জামের ছিটেফোঁটাও ছিল না, ছিল না কোনো প্রাথমিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। আর সেই চরম গাফিলতি ও অবহেলার বলী হতে হলো চার-চারটি তরতাজা প্রাণকে। সাধারণ নির্মাণকাজে ঘাম ঝরিয়ে দিন আনা দিন খাওয়া চার শ্রমিকের জীবন প্রদীপ এক নিমেষে নিভে গেল । কাছাড় জেলার অন্তর্গত কুমারপাড়া-নিজ জয়নগর জিপির কুমারপাড়া গ্রামে এক নির্মীয়মাণ ভবনের জলের ট্যাংকে নেমে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালেন নিলয় পাল, সম্পু পাল, নন্দন পাল এবং দেবাশীষ পাল নামে চার শ্রমিক। এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় সমগ্র কাছাড় জেলা জুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
শুক্রবার দিনটিতে নির্মীয়মাণ ভবনের মাটির নিচের একটি রুদ্ধ ও অপরিসর জলের ট্যাংক পরিষ্কারের কাজ চলছিল। কোনো প্রকার মাস্ক, অক্সিজেন সিলিন্ডার বা নিরাপত্তা দড়ি ছাড়াই প্রথম এক শ্রমিক ট্যাংকের গভীরে নেমে যান। কিন্তু নেমেই তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসে এবং মুহূর্তের মধ্যে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। উপরে থাকা সহকর্মী কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বন্ধুকে বাঁচাতে বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে ট্যাংকের ভেতরে ঝাঁপ দেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, তাকেও গ্রাস করে সেই বিষাক্ত বাতাস। একে একে চার বন্ধু পরস্পরকে বাঁচানোর এক মানবিক তাড়নায় মৃত্যুকূপের ভেতরে নামেন এবং চারজনই নিস্তেজ হয়ে পড়েন ট্যাংকের তলদেশে।

ঘটনার কথা জানাজানি হতেই এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিষাক্ত গ্যাসের ভয়ে প্রথমে কেউ ভেতরে নামতে সাহসিকতা দেখাতে পারছিলেন না। খবর দেওয়া হয় উদ্ধারকারী দল এফডিআরএফ ও পুলিশকে। তবে সরকারি উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই সময়ের অপচয় না করে সাহসিকতার এক অনন্য নজির গড়ে তোলেন স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য দিব্যেন্দু দাস।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং স্থানীয়দের সহায়তায় চার নিস্তেজ শ্রমিককে বাইরে বের করে আনেন। তড়িঘড়ি করে তাঁদের শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। চিকিৎসকরা চারজনকেই ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করেন। একসাথে একই পরিবারের বা একই এলাকার চার তরুণের এমন অকাল প্রয়াণে হাসপাতাল চত্বর ও কুমারপাড়া গ্রামে এখন স্বজনদের বোবা কান্না আর মাতম।
পুলিশ ইতিমধ্যেই নির্মীয়মাণ ভবনের মালিক গৌতম পালকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করেছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, শ্রম আইন অনুযায়ী নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া শ্রমিকদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কেন নামানো হলো? ঘটনার খবর পেয়ে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও এসডিআরএফ বাহিনী ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু করেছে বটে, তবে সচেতন মহলের মতে, প্রতিবার এমন দুর্ঘটনার পর কিছুদিন হুলস্থুল হলেও কিছুদিন পর আবার সব ঠাণ্ডা হয়ে যায়।





