আইন অনুযায়ী ‘টাইপ এইট’ বাংলো এবং রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হলেও, এক বছর ধরে হরিয়ানার ফার্মহাউসে কাটাতে হচ্ছে জগদীপ ধনকড়কে।
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ রাজনীতির অন্দরমহলে নাটকীয় পটপরিবর্তন নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেই নাটকের অন্তরালে একজন সাংবিধানিক প্রধানের এমন নিঃশব্দ ও বঞ্চনামূলক পরিণতি সচরাচর দেখা যায় না। গোটা দেশকে চমকে দিয়ে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ থেকে আচমকা সরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তারপর দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে একটি বছর। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভারতের প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়ের মাথার উপর নিজের কোনো স্থায়ী ছাদ নেই।
সংবিধান অনুযায়ী প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে একগুচ্ছ আইনি সুযোগ-সুবিধা ও রাজকীয় জীবনযাত্রার বন্দোবস্ত থাকার কথা থাকলেও, বাস্তবে তাঁর দিন কাটছে অন্যের অনুগ্রহে হরিয়ানার প্রভাবশালী নেতা তথা ওমপ্রকাশ চৌটালার পুত্র অভয় সিং চৌটালার ফার্মহাউসের চার দেওয়ালের মধ্যে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, দেশের এক উচ্চপদস্থ সাংবিধানিক ব্যক্তির এমন করুণ দশা কেন? নেপথ্যে কি তবে নিছকই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা, নাকি গভীর কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ?
ভারতের সংবিধান ও প্রটোকল অনুযায়ী প্রাক্তন সাংবিধানিক পদাধিকারীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সুরক্ষার কথা বলা রয়েছে। ‘ভাইস প্রেসিডেন্টস পেনশন অ্যাক্ট, ১৯৯৭’ (Vice-President’s Pension Act, 1997) অনুযায়ী, দেশের একজন প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি মাসিক দুই লক্ষ টাকা পেনশন পাওয়ার আইনগত অধিকারী। পাশাপাশি, তাঁর নিজের পছন্দসই স্থানে একটি ‘টাইপ এইট’ (Type VIII) বাংলো পাওয়ার কথা।
উল্লেখ্য, এই ‘টাইপ এইট’ ক্যাটাগরি হলো সরকারি আবাসনগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর, যা সাধারণত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের জন্য বরাদ্দ থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, সেই বাসবভনের জল, বিদ্যুৎ, টেলিফোন থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ এবং আসবাবপত্রের সমস্ত খরচ বহন করার কথা সরকারের কোষাগার থেকে। এছাড়াও বিনামূল্যে বিমান ও ট্রেন সফর এবং উন্নত চিকিৎসার সুব্যবস্থাও তাঁর আজীবন প্রাপ্য।
কিন্তু গত বছরের ২১ জুলাই হঠাৎই ব্যক্তিগত ও শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নিজের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর থেকেই যেন খাদের কিনারে এসে ঠেকেছে ধনকড়ের এই সমস্ত সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা। একাধিক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও বিশ্বস্ত সূত্র মারফত প্রকাশ, প্রশাসনিক উদাসীনতা কিংবা দাপ্তরিক মারপ্যাঁচে বছর ঘুরে গেলেও প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির জন্য নির্দিষ্ট সেই সরকারি বাংলোর ব্যবস্থা করে উঠতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রক।
অথচ এই পরিসংখ্যানের তুল্যমূল্য বিচার করলে দেখা যায়, তাঁর ঠিক আগের উপরাষ্ট্রপতি এম ভেঙ্কাইয়া নায়ডুর ক্ষেত্রে পদত্যাগের বা মেয়াদ শেষ হওয়ার বড়জোর মাস দুয়ের মধ্যেই সমস্ত প্রটোকল মেনে সরকারি বাসভবন সুনিশ্চিত করা হয়েছিল। সেখানে বাংলার প্রাক্তন রাজ্যপাল তথা এককালের হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জগদীপ ধনকড়ের কপালে আজও জোটেনি একটি স্থায়ী সরকারি ছাদ।
প্রশাসন ও প্রটোকল যখন নীরব, তখন বাস্তব পরিস্থিতি আরও বেশি শোচনীয়। বিশ্বস্ত সূত্রে খবর, পদ ছাড়ার মাত্র ছ’সপ্তাহের মাথায় বাধ্য হয়েই দিল্লির অদূরে হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমপ্রকাশ চৌটালার পুত্র অভয় চৌটালার বিলাসবহুল ফার্মহাউসে আশ্রয় নিতে হয় ধনকড়কে। ঘনিষ্ঠ মহলের খবর অনুযায়ী, প্রথমে সাকুল্যে মাত্র কয়েকদিনের জন্য সাময়িক থাকতে গিয়েও আজ বাধ্য হয়ে তা এক বছরের স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘ এই সময় ধরে অন্যের বাড়িতে দিন কাটালেও রহস্যজনকভাবে এবিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি নিজে। লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাওয়া ধনকড়ের মুখে কুলুপ আঁটা। অন্যদিকে, এই বিষয়ে স্পটিটি পর্যন্ত খরচ করতে নারাজ কেন্দ্রীয় মন্ত্রকও। কে বা কারা এই দীর্ঘসূত্রিতার নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন, তার সদুত্তর নেই প্রশাসনিক মহলের কোনো দপ্তরেই।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করে যখন চলতি বছরের জুলাই মাসে হঠাৎই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন জগদীপ ধনকড়। আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জয়পুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর সফল অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি সম্পন্ন হয়। একদিকে এই শারীরিক ধকল ও অস্বস্তি, আর অন্যদিকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজের বাড়ি বা নির্দিষ্ট সরকারি বাংলোহীন এক প্রকার যাযাবর জীবন, সব মিলিয়ে রাজনৈতিক মহলে দানা বাঁধছে নানা সন্দেহ ও প্রশ্ন।
২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাজ্যের রাজ্যপালের দায়িত্ব সফলভাবে সামলানোর পর জগদীপ ধনকড়কে দেশের উপরাষ্ট্রপতি পদে আসীন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ২১ জুলাই হুট করে তাঁর এই পদত্যাগ এবং পরবর্তী সময়ে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়ার ঘটনা সমগ্র ভারতীয় রাজনৈতিক বৃত্তে এক গভীর রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
সাংবিধানিক অধিকার থাকা সত্ত্বেও কেন এই বঞ্চনা? ক্ষমতার অলিন্দ থেকে হঠাৎ এই ছিটকে যাওয়া কি নিছকই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনো অদৃশ্য রাজনৈতিক চিত্রনাট্য? এই সমস্ত কঠিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন আকুল দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।








