১৯৫৯-এর ঐতিহাসিক আন্দোলন ও পুলিশের পৈশাচিকতার ৬৭ বছর, শাসক বদলালেও বদলায়নি সাধারণ মানুষের ভাগ্য
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান যখন কার্যকর হয়েছিল, তখন এ দেশের অগণিত দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষ বুকে এক বুক আশা বেঁধেছিলেন। সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল ছিল না, তা ছিল প্রতিটি নাগরিককে বেঁচে থাকার মৌলিক নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, সেই সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি কি আদৌ পূরণ হয়েছে, নাকি তা শুধুই খাতায়-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে?
সংবিধানের তিনটি মৌলিক ধারা দেশকে এই নির্দেশই দিয়েছিল, ধারা ৪৭, পুষ্টির মান বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং নাগরিকদের জীবনধারণের মান বাড়ানো ভারত রাষ্ট্রের পরম অগ্রাধিকার ও পবিত্র দায়িত্ব। ধারা ২১ দেশের প্রতিটি মানুষের সম্মানের সাথে ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার অধিকার সুনিশ্চিত করা। ধারা ৩৯(ক) লিঙ্গনির্বিশেষে সকল নাগরিকের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও পর্যাপ্ত উপায়ের ব্যবস্থা করা।
স্বাধীনতার পর এই প্রগতিশীল ধারাগুলি সংযোজনের জন্য তৎকালীন ভারতের জাতীয় কংগ্রেসকে সমাজের একটি বড় অংশ কৃতিত্ব দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস ও বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর কংগ্রেস পরিচালিত সরকার যেমন নিজেদের তৈরি সাংবিধানিক অঙ্গীকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছিল,
তেমনই পরবর্তীতে এবং বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি সরকারও দেশের প্রতিটি মানুষের পেটে খাদ্য সুনিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ। ব্যবস্থার এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার মূল কারণ ভারতে বজায় থাকা ব্যক্তিমালিকানাধীন ও পুঁজিপতিবান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামো, যেখানে মানুষের পেটের খিদের চেয়ে করপোরেট মুনাফা এবং মজুতদারদের স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পর থেকেই ভারতজুড়ে, বিশেষ করে বাংলায়, খাদ্য সংকট এক ভয়াবহ রূপ নেয়। একদিকে দেশভাগের ক্ষত, অন্যদিকে অসাধু বড় ব্যবসায়ী, জমিদার ও গুদাম মালিকদের সীমাহীন লোভ এবং কৃত্রিম মজুতদারি সব মিলিয়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। অভিযোগ ওঠে, পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায় এই কালোবাজারি ও ফাটকাবাজদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেননি। কারণ, এই অসাধু ধনকুবেররাই ছিলেন তৎকালীন শাসক দল কংগ্রেসের প্রধান রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতার উৎস।
একদিকে যখন খাদ্য সংকট চরমে, অন্যদিকে তখন পূর্ববঙ্গ থেকে আসা বাস্তুহারা শরণার্থীদের ত্রাণ ও বাসস্থানের সুব্যবস্থা করার বদলে কংগ্রেস সরকার তাঁদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা করতে থাকে। এর ফলশ্রুতিতেই ১৯৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পেশ করা হয়েছিল বিতর্কিত ‘এভিকশন বিল’। ১৯৫৭-৫৮ সালে খাদ্যাভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
১৯৫৯ সালে গিয়ে দেখা যায়, এক সের (প্রায় এক কেজি) চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ পয়সায়। শুনতে কম মনে হলেও, সে সময় দেশের মানুষের মাথা পিছু গড় মাসিক আয় ছিল মাত্র ২৫ টাকা। আর দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের আয় ছিল এই গড়েরও নিচে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের কাছে এক কেজি চাল কেনাও এক বিলাসিতায় পরিণত হয়েছিল।
এই অমানবিক পরিস্থিতিতে জুন মাস নাগাদ বামপন্থী দলগুলির সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠে প্রাইস ইনক্রিজ অ্যান্ড ফেমিন রেজিস্ট্যান্স কমিটি’। তাদের নেতৃত্বেই রাজপথে নেমে আসে ক্ষুব্ধ জনতা শুরু হয় ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন। সাধারণ মানুষের এই সতস্ফূর্ত ও বিশাল গণ-আন্দোলনের ঢেউ তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) ভেতরের আপসকামিতার রাজনৈতিক অংককেও ওলটপালট করে দিয়েছিল।
কিন্তু জনগণের খিদের দাবির সামনে খাদ্য তুলে দেওয়ার বদলে বিধানচন্দ্র রায়ের পুলিশ বেছে নিয়েছিল দমনপীড়নের চরম অমানবিক পথ। মিছিল ভাঙতে নিয়মিত কাঁদা গ্যাস ছোঁড়া ও লাঠিচার্জ করা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় ৭,০০০ আন্দোলনকারীকে।
সেদিন মধ্য কলকাতার রাজপথে নেমে এসেছিল হাজার হাজার কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ ও ছাত্র। দাবি একটাই—’খাদ্য চাই’। কিন্তু এসপ্ল্যানেড এবং ধর্মতলা অঞ্চলে মিছিল পৌঁছাতেই পুলিশ পৈশাচিক আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পালানোর সমস্ত পথ বন্ধ করার জন্য এসপ্ল্যানেডের গলি ও চ্যানেলগুলিতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। পুলিশের লাঠিচার্জ ও গুলির আঘাতে সেদিন রাজপথেই প্রাণ হারান ৮০ জন আন্দোলনকারী।
মিছিলে যোগ দিয়ে আর কোনোদিন ঘরে ফেরেননি ২০০-রও বেশি মানুষ। সোমবার ৩১ আগস্ট, ২০২৬ এই রক্তঝরা খাদ্য আন্দোলনের শহীদ দিবসের ৬৭ বছর পূর্তি। ৬৭ বছর আগে রাজপথে রক্ত ঝরেছিল চালের দাবিতে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরেও কি আজ ভারতের চিত্র বদলেছে? উত্তর দিচ্ছে বর্তমানের করুণ পরিসংখ্যান।
২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’ এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১২৩টি দেশের মধ্যে ভারতের বর্তমান স্থান ১০২ নম্বরে। খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করার বড় বড় সরকারি দাবির ফাঁকে খিদের বাস্তব রূপ অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে স্থান (২০২৫), ১২৩টি দেশের মধ্যে ১০২তম (গুরুতর ক্ষুধা ক্যাটাগরি), অপুষ্টিতে ভুগছে এমন জনসংখ্যা| মোট জনসংখ্যার ১২% (প্রায় ১৫ কোটি ৭২ লক্ষ মানুষ), অপুষ্টির হারের অবনতি, ২০১৬ সালের ১১.৬% থেকে বেড়ে ২০২৫-এ দাঁড়িয়েছে ১২%, অপুষ্টিজনিত শিশু মৃত্যু, ৫ বছর বয়সের আগেই মারা যায় দেশের ২.৮% শিশু | কংগ্রেস আমলের চালের আকাল থেকে শুরু করে আজকের বিজেপি আমলের ক্ষুধা সূচকের এই তলানি দল বা শাসক পরিবর্তিত হলেও দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। স্বাধীনতার পর থেকে আজও পর্যন্ত ব্যক্তিস্বার্থ ও ফাটকাবাজিকে প্রশ্রয় দেওয়ার নীতি বহাল রয়েছে।
রাষ্ট্র তার সমস্ত নাগরিককে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। দেশের ১৫ কোটি ৭২ লক্ষ মানুষ আজ রাতেও পেটে খিদে নিয়ে ঘুমাতে যান, হাজার হাজার শিশু প্রতিদিন অপুষ্টির শিকার হয়ে প্রাণ হারায় যা আসলে রাষ্ট্রের ব্যর্থতারই এক নীরব দলিল। ১৯৫৯ সালের ৩১ আগস্টের শহীদের রক্ত আজ ৬৭ বছর পরও ক্ষমতার অলিন্দে দাঁড়িয়ে একটি সোজা প্রশ্ন ছোঁড়ে, ভারতের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি কি কেবলই ফাঁপা স্লোগান, নাকি এ দেশের দরিদ্র মানুষ কোনোদিন পেট ভরে খাবারের অধিকার পাবে?






