গুমড়া পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান সার্কেল অফিসারের, সড়ক দখলমুক্ত করতে একশ মিটারের মধ্যে দোকান-পার্কিং নিষিদ্ধের নির্দেশ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২মেঃ দীর্ঘদিন ধরে যানজট, অবৈধ দখলদারি ও অনিয়ন্ত্রিত পার্কিংয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল কাটিগড়া এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র জালালপুর বাজার। প্রতিদিন শত শত যানবাহন, পথচারী, ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছিল। অভিযোগ ছিল, একাংশ ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী মহলের মদতে সরকারি সড়কের একাংশ কার্যত ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করা হচ্ছিল।
রাস্তার উপরই দোকানপাট, মালপত্রের স্তূপ, অবৈধ পার্কিং এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কারণে বাজার এলাকায় স্বাভাবিক চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এই পরিস্থিতিতে সোমবার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন কাটিগড়ার সার্কেল অফিসার যাত্রা কান্ত কর্মকার। গুমড়া পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সরাসরি জালালপুর বাজারে পৌঁছে যানজট নিরসন ও অবৈধ দখলমুক্তকরণ অভিযান পরিচালনা করেন। প্রশাসনের এই হঠাৎ অভিযানে বাজারজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
অভিযান চলাকালীন রাস্তার উপর অবৈধভাবে স্থাপন করা দোকানপাট, অস্থায়ী কাঠামো, মালপত্র এবং পার্কিং ব্যবস্থা সরিয়ে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয় যে, জাতীয় সড়ক ও সংযোগ সড়কের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে কোনও ধরনের দোকান, স্টল কিংবা পার্কিং বসানো যাবে না। সড়কের দুই পাশে অন্তত একশ মিটারের মধ্যে যাতে পুনরায় অবৈধ দখল না হয়, সে ব্যাপারেও কঠোর সতর্কবার্তা দেন সার্কেল অফিসার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুদিন ধরেই জালালপুর বাজারে প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছিল সড়ক দখলের রমরমা ব্যবসা। রাস্তার একাংশ জুড়ে দোকান বসিয়ে রাখা, নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, এমনকি ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাণিজ্যিক যানবাহনের অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। প্রতিদিন বাজার এলাকায় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হতো। স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রী, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, সাধারণ যাত্রীবাহী যানবাহন—সকলকেই এই বিশৃঙ্খলার শিকার হতে হচ্ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, কাটিগড়া চৌরঙ্গী ও কালাইন বাজারে প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানের পর কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরে এলেও জালালপুর বাজারে পরিস্থিতি দিনদিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। রাস্তার উপর অবৈধ পার্কিং এবং দোকানপাটের কারণে অনেক সময় পথচারীদের রাস্তা ছেড়ে বিপজ্জনকভাবে যানবাহনের ফাঁক দিয়ে চলাচল করতে হতো। বিশেষ করে বাজারের ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে উঠত যে, কয়েকশ মিটার পথ অতিক্রম করতেও দীর্ঘ সময় লেগে যেত। প্রশাসনের এই অভিযানে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে। বহু বাসিন্দা সার্কেল অফিসার যাত্রা কান্ত কর্মকারের উদ্যোগকে সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অনিয়মের বিরুদ্ধে এমন দৃঢ় অবস্থান নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।
তবে একইসঙ্গে উঠছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও। স্থানীয়দের একাংশের মতে, শুধু একদিনের অভিযান চালিয়ে ছবি তুলে চলে গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও কয়েকদিন পরই আবার পুরনো চিত্র ফিরে এসেছে। ফলে এবার প্রশাসন কতটা ধারাবাহিক নজরদারি বজায় রাখতে পারে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষ। প্রশ্ন উঠছে, এতদিন ধরে সরকারি সড়ক দখল করে ব্যবসা ও পার্কিং চললেও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলির নজরে বিষয়টি কেন আসেনি? অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আগে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? কারা এই দখলদারির নেপথ্যে মদতদাতা ছিল? প্রশাসনের এই অভিযানের পর এলাকাবাসীর মধ্যে এমন প্রশ্নও জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে।
সচেতন মহলের মতে, জালালপুর বাজারকে স্থায়ীভাবে যানজটমুক্ত করতে হলে নিয়মিত মনিটরিং, নির্দিষ্ট পার্কিং জোন চিহ্নিতকরণ, ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত রাখা এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় কয়েকদিনের মধ্যেই আবার পুরনো অবস্থা ফিরে আসার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বর্তমানে প্রশাসনের কড়া অবস্থানের ফলে জালালপুর বাজারে স্বাভাবিক যান চলাচল অনেকটাই ফিরেছে। কিন্তু এই স্বস্তি সাময়িক নাকি স্থায়ী রূপ পাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, কাটিগড়া চৌরঙ্গী ও কালাইনের মতো জালালপুর বাজারেও প্রশাসনের এই অভিযান নিয়মিত চলবে এবং সরকারি সড়ক আর কখনও ব্যক্তিগত স্বার্থে দখল হতে দেওয়া হবে না। জনগণের করের টাকায় নির্মিত সড়ক জনগণের জন্যই উন্মুক্ত থাকবে, এটাই এখন এলাকাবাসীর প্রধান দাবি।






