ধলছড়ার ৫০টি পরিবারের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি, প্রতিশ্রুতি না মিটলে রাজপথ অবরুদ্ধ করার কড়া বার্তা এলাকাবাসীর
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৩ আগষ্টঃ ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌছে দেওয়া হবে, নির্বাচনের মুখে নেতা-মন্ত্রীদের মুখে এই বুলি শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা সাধারণ মানুষের। কিন্তু ভোট মিটলেই যে সেই প্রতিশ্রুতি কেবলই ফাঁকা আওয়াজে পরিণত হয়, উন্নয়ন এখন ঘরে ঘরে, জনকল্যাণই শেষ কথা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে বড় বড় ফ্লেক্স-ব্যানারে প্রতিদিন এমন হাজারো ঢোল পেটানো বিজ্ঞাপনের ঝলক দেখা যায়।
কিন্তু সেই চকচকে প্রচারের উল্টো পিঠে যে কত বড় এক নরককুণ্ড লুকিয়ে রয়েছে, তার সবচেয়ে নিকৃষ্ট নজির হয়ে উঠেছে কাছাড় জেলার কাটিগড়া বিধানসভা এলাকার ধলছড়া বিএসএফ ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে, মহাকাশে রকেট পাঠাচ্ছ, কিন্তু স্বাধীন ভারতের আট দশক ছুঁইছুঁই হতে চলেও কাটিগড়ার ধলছড়ার প্রায় ৫০টি পরিবারকে তৃষ্ণা মেটাতে হচ্ছে কালভার্টের নিচে জমা থাকা নর্দমার দূষিত জল খেয়ে!

তীব্র দাবদাহ আর ভ্যাপসা গরমে যখন এক ফোঁটা পানীয় জলের জন্য হাহাকার পড়ে গেছে, তখন সরকারি নলকূপ বা পাইপলাইনের কোনো অস্তিত্বই নেই এই এলাকায়। বাধ্য হয়ে নর্দমার দুর্গন্ধযুক্ত, রোগজীবাণুভরা জল বালতিতে ছেঁকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন মহিলারা। আর সেই বিষাক্ত জল পান করে একের পর এক অসুস্থ হয়ে পড়ছে নিষ্পাপ শিশুরা। অথচ, শাসকদলের স্থানীয় বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ এবং জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা যেন চোখ-কান বন্ধ করে এক মহানিদ্রায় মগ্ন হয়ে আছেন!
ধলছড়া বিএসএফ ক্যাম্প সংলগ্ন এই ৫০টি পরিবারের জীবনসংগ্রামের বাস্তব চিত্র রূপকথা বা কোনো হরর সিনেমার চেয়ে কম কিছু নয়। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এলাকার নারী-পুরুষদের একমাত্র মিশন থাকে—জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও কালভার্টের নিচে নেমে জল জোগাড় করা। রাস্তার নিচে জমে থাকা নালার কালো জল ছেঁকে বালতিতে তোলা হয়।
সেই জলের ওপর ভাসে মশা-মাছির লার্ভা, জমে থাকে পলি আর বর্জ্য পদার্থ। সেই নোংরা জল দিয়েই গৃহস্থালির রান্না থেকে শুরু করে বোতলে ভরে মেটানো হচ্ছে বাচ্চাদের তৃষ্ণা। ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে, ঘরে ঘরে দেখা দিচ্ছে ডায়রিয়া, কলেরা, পেটের তীব্র যন্ত্রণা এবং ত্বকের নানা জটিল সংক্রামক ব্যাধি।
এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় ক্ষোভ শাসকদলের স্থানীয় বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থের ওপর। ভুক্তভোগী মানুষের অভিযোগ, প্রতিবার নির্বাচনের ঠিক মুখে হাসিমুখে এই ধলছড়ায় আসেন নেতারা। হাত জোড় করে বিশাল বিশাল প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, জিতলেই প্রথম কাজ হবে সুপেয় পানীয় জলের স্থায়ী সমাধান করা। কিন্তু ব্যালট বাক্স বা ইভিএম বন্দি হতেই চিরতরে হারিয়ে যান প্রতিনিধিরা। একাধিকবার কমলাক্ষ বাবুর দ্বারে গিয়ে দরবার করেছেন গ্রামবাসীরা। কিন্তু মেলেছে কেবলই আশ্বাস যাকে স্থানীয়রা এখন “ভোটের কৌশল” এবং “ফাঁকা বুলি” বলে কটাক্ষ করছেন।
ক্ষুব্ধ এক গ্রামবাসীর প্রশ্ন, মাত্র ৫০টি পরিবারের জন্য একটা পানীয় জলের ফিল্টার বা পাইপলাইনের ব্যবস্থা করতে যদি একজন শাসকদলের প্রভাবশালী বিধায়কের পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় লেগে যায়, তবে তাঁর ক্ষমতার ও উন্নয়নের বুলি ঝাড়ার কোনো নৈতিক অধিকার আছে কি? সাধারণ মানুষের করের টাকায় ভাতা আর গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়াবেন নেতারা, আর আমাদের সন্তানরা ড্রেনের জল খাবে এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র?
কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ঢাকঢোল পেটানো ‘জল জীবন মিশন’ প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা আদতে কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে এবার বিরাট বড় প্রশ্ন উঠে গেল। সরকার দাবি করে, প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারে ট্যাপের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে ধলছড়ার এই বিএসএফ ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা কি ভারতের মানচিত্রের বাইরে?
নাকি এই দরিদ্র পরিবারের মানুষগুলোর জীবনের কোনো মূল্যই নেই জেলা জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগের আধিকারিকদের কাছে? সরকারি দপ্তর ও ইঞ্জিনিয়ারদের এই নির্লজ্জ উদাসীনতা ও অপেশাদারিত্বের কারণে আজ পুরো এলাকা এক স্বাস্থ্যজনিত বিপর্যয়ের মুখোমুখি। নিকাশি ড্রেনের জল খাওয়া কেবল অপমানজনকই নয়, বরং এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
আর কোনো মিথ্যা আশ্বাস বা টেবিল-চেয়ারের প্রতিশ্রুতিতে ভুলতে রাজি নন ধলছড়ার ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। জলকষ্টে জর্জরিত এই ৫০টি পরিবার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত অবিলম্বে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ট্যাঙ্কার পাঠাতে হবে। দ্রুত এলাকায় গভীর নলকূপ বা পাইপলাইনের কাজ শুরু করতে হবে।
ড্রেনের জল খেয়ে অসুস্থ হওয়া শিশুদের চিকিৎসার যাবতীয় দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। প্রশাসন এবং বিধায়ক যদি অবিলম্বে তাঁদের সুনিদ্রা ভেঙে কার্যকর পদক্ষেপে না নামেন, তবে ধলছড়ার নারী-পুরুষ এবার রাজপথে নেমে কাটিগড়া-শিলচর সড়ক অবরুদ্ধ করতে বাধ্য হবেন। প্রশাসনের এই নির্লজ্জ নীরবতা আর কতদিন চলবে? এই ৫০টি পরিবারের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা কি অবশেষে তাঁদের ঘুম ভাঙাবেন, নাকি কোনো বড়সড় প্রাণহানির অপেক্ষায় বসে থাকবেন, এখন সেটাই দেখার!





