বিভাজনের তাণ্ডবে উত্তপ্ত উত্তর-পূর্ব! নেতাজি-বিবেকানন্দের অবমাননা ও অনন্তর বিষোদ্গারে শিলচরে প্রতিবাদের ঝড়

শনিবার বিকেলে ঐতিহাসিক শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর পূর্ণাঙ্গ মূর্তির পাদদেশে নেতাজি চর্চা সমিতি ও কেন্দ্রীয় নেতাজী জন্মদিবস উদযাপন কমিটির যৌথ উদ্যোগে এক বিশাল প্রতিবাদী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক এবং সাধারণ যুবসমাজের অগণিত উপস্থিতি প্রমাণ করে দিল, জাতীয় বীরদের অপমান আর মুখ বুজে সহ্য করবে না ঐতিহ্যবাহী বরাক।

গত ১৯ আগস্ট মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে যা ঘটেছে, তা কেবল কোনো একটি গোষ্ঠীর ওপর হামলা নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতির ওপর সরাসরি কুঠারাঘাত। উন্মত্ত জনতা যেভাবে স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং বিশ্ববরেণ্য মহাপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি ভাঙচুর করেছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। সঙ্গে যোগ হয়েছে অ-খাসি ও সাধারণ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর হিংসাত্মক হামলা।

সমাবেশে উপস্থিত বক্তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, প্রতিবাদের অধিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবারই আছে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের নামে হিংসা ছড়ানো, ভাঙচুর চালানো এবং জাতীয় বীরদের মূর্তি চুরমার করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই ধরনের অপচেষ্টা সমাজে বিভাজন তৈরি করে বহুজাতিক ভারতের মূল ভিতকে দুর্বল করার এক সুগভীর চক্রান্ত। আগুন জ্বলছিল এমনিতেই, তাতে ঘি ঢেলেছেন তথাকথিত অনন্ত মহারাজ।

জাতীয় বীর ও একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ করে তাঁর উসকানিমূলক এবং কটূক্তিকর বক্তব্য আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে। সমাবেশে বক্তারা অনন্ত মহারাজের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রশ্ন তোলেন, সংবিধানের সুবিধা ভোগ করে কীভাবে একশ্রেণির লোক প্রকাশ্যে এমন প্রজাতিবাদী উসকানি দেওয়ার সাহস পায়? প্রশাসন কেন তাঁর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করছে না?

সমাবেশে অন্যতম প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডঃ তপোধীর ভট্টাচার্য্য প্রশাসনের ঢিলেঢালা মনোভাবের কড়া সমালোচনা করেন। আবেগবিহ্বল অথচ দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, যে স্বাধীনতার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষেরা নিজের রক্ত দিয়েছেন, জীবনের সোনালী দিনগুলো কারান্তরালে কাটিয়েছেন, সেই ইতিহাস ও জাতীয় স্মৃতির প্রতীকগুলির ওপর হামলা চালানো কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। প্রতিবাদের নাম করে আগুন জ্বালানো, ভাঙচুর করা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অপমান করা স্পষ্টতই দেশদ্রোহিতা। প্রশাসনকে অবিলম্বে দলমত নির্বিশেষে এই দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

সুখ্যাত নেতাজি গবেষক ও লেখক নীহার রঞ্জন পাল তাঁর বক্তব্যে উগ্র প্রজাতিবাদের এই ব্যাধি দূর করতে শিক্ষার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অদম্য নায়ক; তাঁর মূর্তির অবমাননা কেবল একজনের অপমান নয়, তা গোটা জাতির গর্ব ও ঐতিহ্যের অবমাননা। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কেবল পুলিসি তদন্তে এই মানসিকতা দূর করা যাবে না। নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস চেনাতে প্রাথমিক স্তর থেকেই নেতাজি ও অন্যান্য বিপ্লবীদের প্রকৃত জীবন ও আদর্শ পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

প্রতিবাদী যুবনেতা প্রসেনজিৎ দেব বলেন, স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ভাষার সম্পদ নন, তাঁরা সমগ্র ভারতের গর্ব। ভাবাদর্শগত মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু জাতীয় প্রতীক ও বীরদের গায়ে হাত দেওয়া মানে দেশের জাতীয় পতাকাকে অবমাননা করা।

এই বিচ্ছিন্নতাবাদী তাণ্ডব অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। প্রশান্ত ভট্টাচার্য্যের বলিষ্ঠ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সর্বসম্মতিক্রমে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের কাছে তিনটি স্পষ্ট দাবি পেশ করেন, শিলংয়ে মূর্তি ভাঙচুর এবং বাঙালিদের ওপর হামলায় জড়িত মূল আসামীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ধারায় শাস্তি দিতে হবে।

উসকানিমূলক বক্তব্য রেখে সামাজিক সৌহার্দ্য বিনষ্ট করার অপরাধে অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। মেঘালয়সহ সমগ্র উত্তর-পূর্বে অ-খাসি বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে এবং সমস্ত জাতীয় স্মারকে বিশেষ নিরাপত্তা দিতে হবে।

সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিয়াব উদ্দিন আহমেদ, হরিদাস দত্ত, সঞ্জীব রাই, সাধন পুরকায়স্থ, নিখিল পাল, মিহির নন্দী, সুজিত দেব, পীযূষ চক্রবর্তী, সীমান্ত ভট্টাচার্য্য, শ্যামদেব কর্মী, বন্দিতা ত্রিবেদী ও রাজেশ সিনহা। বক্তারা একসুরে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, আজ শিলচরের এই ক্ষোভ কেবল একটি প্রতিবাদী সভা নয়, এটি জাতীয় সংহতি রক্ষার লড়াইয়ের সূচনা। যদি সরকার ও প্রশাসন অবিলম্বে এই উগ্র প্রজাতিবাদী ও জাতীয় বীর অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ না নেয়, তবে আগামী দিনে আন্দোলন আরও তীব্র রূপ নেবে।

Related Posts

ধলাইয়ের সপ্তগ্রামে পুলিশের অভিযানে কোটি টাকার ইয়াবা ও বিপুল বার্মিজ সুপারি উদ্ধার, জালে দুই পাচারকারী

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৩ আগষ্টঃ যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার অন্ধকার খেলায় মেতে উঠেছে মাদক মাফিয়ারা। তবে এবার সেই বিষাক্ত জালে বড়সড় থাবা বসাল ধলাই থানার পুলিশ।…

কাটিগড়ার ধলছড়ায় পানীয় জলের হাহাকার, ড্রেনের বিষাক্ত জল খেয়ে কাটছে দিন, কোথায় হারিয়ে গেলেন বিধায়ক?

ধলছড়ার ৫০টি পরিবারের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি, প্রতিশ্রুতি না মিটলে রাজপথ অবরুদ্ধ করার কড়া বার্তা এলাকাবাসীর বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৩ আগষ্টঃ ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌছে দেওয়া হবে, নির্বাচনের মুখে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *