কাটিগড়ার ঐতিহ্যবাহী গুমড়া বাজারে কোটি টাকার ভিটা-দুর্নীতি!

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিস্ফোরক অভিযোগে শোরগোল পড়ে গিয়েছে সমগ্র কাটিগড়া জুড়ে। অভিযোগের সরাসরি তির তৎকালীন বিডিও সৌরভ প্রতিম গগৈ এবং ব্লকের তৎকালীন জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট মুজাহিদুল ইসলাম লস্করের দিকে। প্রকাশ্য দিবালোকে অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন বিত্তশালী ব্যবসায়ী ও দালালের যোগসাজশে দোকানের সরকারি ভিটা অবৈধভাবে দখলে নিতে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার এক বিপুল তহবিল সংগ্রহ করে বিডিও অফিসে জমা দেওয়া হয়েছিল!

ক্ষুব্ধ এক প্রবীণ ব্যবসায়ীর খোলামেলা তোপ, যাঁরা জীবনে কোনোদিন এক টাকার ব্যবসা করেননি, আলু-পটল বা চালের ব্যাগ হাতে ধরেননি, ব্লক অফিসের সিন্ডিকেট চক্রকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে গুমড়া বাজারের সরকারি ভিটা এখন তাঁদের নামে অ্যালটমেন্ট করা হয়েছে! তৎকালীন বিডিওর কাছে বহুবার সুবিচারের আশায় ধর্ণা দিলেও কোনো সুরাহা মেলেনি, উল্টে জুটেছে নীরবতা। এমনকি বাজারের ভিটার লিজ রিনিউ করতে গেলে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন খেলা। সরকারি রশিদে যে টাকা লেখা থাকছে, আসল টেবিলে আদায় করা হচ্ছে তার দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ। পকেট না ভরালে মিলছে না কাগজ, বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে পুরোনো ব্যবসায়ীদের বৈধ নথি।

গুমড়া বাজারে এখন চলছে এক নতুন ধরণের জমিদারি প্রথা। দালালি ও রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের স্বজনদের নামে ভিটা লিজ নিয়ে নিচ্ছেন। এরপর সেই সরকারি জায়গাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে অন্য দরিদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে সাব-লেট বা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক-একটি কৌশলগত ভিটা ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বেআইনিভাবে হস্তান্তর করা হচ্ছে অন্যের কাছে! আজব কাণ্ড হলো, লিজ পাওয়া পাথর ও কয়লা ব্যবসায়ীদের জীবনেও এই বাজারে কোনো দোকান চালাতে দেখা যায়নি। ফলে বহু দোকান খালি পড়ে থেকে ভূতুড়ে ঘরের রূপ নিয়েছে, আর মূল বাজারের প্রাণকেন্দ্রটি হয়ে উঠেছে এক বন্ধ দরজার গুদামঘর।

দুর্নীতির বিষবাষ্প ছড়িয়েছে জেলা পরিষদের উন্নয়নমূলক প্রকল্পেও। অতীতে জেলা পরিষদ সদস্যা ত্রয়বাসী দাস তাঁর পূর্ববর্তী মেয়াদকালে গুমড়া বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে চারটি সুবিশাল মার্কেট শেড নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ তার বাস্তব চিত্র চমকে ওঠার মতো! অজ্ঞাত কারণে একটি আধুনিক শেড গোড়া থেকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর বাকি তিনটি শেডে মোটা টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে শাটার লাগিয়ে লিজ দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তা সবসময় বন্ধ করে রাখা হয়।

সম্প্রতি গভীর রাতের অন্ধকারে একদল অসাধু ব্যবসায়ী একটি সরকারি মার্কেট শেড রাতারাতি টিনের বেড়া দিয়ে দখল করে নেওয়ার চেষ্টা করলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। পরবর্তীতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেটি দখলমুক্ত করা হলেও ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ে আমজনতার মধ্যে।

ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বাণিজ্য কেন্দ্র গুমড়া বাজার আজ চরম প্রশাসনিক অবহেলা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বাজারের সার্বিক অব্যবস্থা এবং দিনের পর দিন চলা অনিয়মের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ী সমাজ। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁরা কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনেছেন, একটি ঐতিহ্যবাহী পুরনো বাজারে কেন আজও কোনো বৈধ এবং সর্বসম্মতভাবে নির্বাচিত স্থায়ী বাজার কমিটি গঠন করা হলো না? কার স্বার্থ রক্ষা করতে এবং কোন অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে এই অচলাবস্থা জিইয়ে রাখা হয়েছে? একটি নিবন্ধিত কমিটি না থাকার সুযোগে কারা পেছন থেকে বাজারের সমস্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে? বিগত ৫ বছরে গুমড়া বাজার থেকে ট্যাক্স ও খাজনা বাবদ আদায় হয়েছে কোটি কোটি টাকা।

সাধারণ ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের প্রশ্ন, এই বিপুল পরিমাণ রাজস্বের একটা টাকাও কি বাজারের নিকাশি (ড্রেনেজ) ব্যবস্থার উন্নয়ন বা ন্যূনতম পরিকাঠামো নির্মাণে খরচ করা হয়েছে? নাকি সরকারি তহবিলে জমা পড়ার আগেই এই টাকা সোজাসুজি চলে গেছে একশ্রেণীর দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে? চোখের সামনে সরকারি খাস জমি দখল করে রাতারাতি কোনো বৈধ অনুমতি ছাড়াই গড়ে উঠছে বিলাসবহুল দ্বিতল দোকান ও বাসগৃহ। প্রশাসনিক নজরদারির নাকের ডগায় কীভাবে এমন বেআইনি নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে? কার ছায়ায় ও মদদে এসব চলছে?  

ফুটপাতে বসে থাকা প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বঞ্চিত বেকার যুবক এবং স্থানীয় সচেতন মহল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন,  ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। যদি অবিলম্বে কালাইন ব্লক প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন গুমড়া বাজারের প্রতিটি ভিটার নথিপত্র পুনরায় তদন্ত না করে, অন্যায়ভাবে লিজ পাওয়া অ-ব্যবসায়ীদের অ্যালটমেন্ট বাতিল না করে এবং প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন না দেয়, তবে আগামীতে কাটিগড়ার রাজপথে আছড়ে পড়বে নজিরবিহীন গণআন্দোলন। আইন ও নিয়মনীতির ধুলো উড়িয়ে চলতে থাকা এই কোটি টাকার ভিটা-সিন্ডিকেট ভাঙতে জেলা আয়ুক্ত ও আসাম সরকারের রাজ্য ভিজিল্যান্স বিভাগ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই চোখ পুরো কাছাড়বাসীর।

Related Posts

শিলচর পুরনিগম নির্বাচন: ডিগ্রিতে জালিয়াতি করলেই কপালে শনি, জাল সার্টিফিকেট জমা দিলেই শ্রীঘরে যাওয়ার রাস্তা পাকা!

ভুঁইফোড় বোর্ডের সার্টিফিকেট দিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না, মেধা ও সততার অগ্নিপরীক্ষায় নামতে হচ্ছে প্রার্থীদের, শিলচর পুরনিগম নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের কড়া হুঁশিয়ারি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার…

শিলচরে ব্যবসার নামে লোভনীয় লভ্যাংশের ফাঁদ পেতে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ, শিলচরের বেরেঙ্গার সাদ্দামের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

গ্রেপ্তারির পর জামিনে বেরিয়ে সামাজিক বিচারসভার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ; ২৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই উধাও প্রতারক। বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র শিলচরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *