বন্যায় ১০ বছরে ৮৩৬ মৃত্যু, চলতি বছরেও প্রাণহানি প্রায় শতাধিক, বছরের পর বছর একই বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ বর্ষা এলেই অসমে শুরু হয় এক চেনা আতঙ্কের পুনরাবৃত্তি। আকাশে মেঘ জমলেই নদী তীরবর্তী মানুষের মনে জেগে ওঠে অজানা আশঙ্কা এবার জল কতদূর উঠবে? ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদি পশু কিংবা প্রিয়জন আর কী কী হারাতে হবে? বছরের পর বছর ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই কাটছে অসমের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবন।
বন্যা যেন এই রাজ্যের মানুষের কাছে প্রতিবছরের এক অনিবার্য যুদ্ধ। প্রতিবছর বর্ষাকালে ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলির জলস্ফীতি অসমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে প্লাবিত করে। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, নষ্ট হয় কৃষিজমি ও ফসল, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তা-ঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। গবাদি পশু হারিয়ে নিঃস্ব হন বহু পরিবার। আর কখনও কখনও বানের স্রোতে হারিয়ে যায় মানুষের জীবন।
চলতি বছরের পরিস্থিতি সেই পুরনো ক্ষতের উপর নতুন করে আঘাত হেনেছে। আপার অসমের তিনটি জেলা সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ বন্যায় ইতিমধ্যেই প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কাদা-পলি ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উদ্ধার হচ্ছে মৃতদেহ। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা আসলে একেকটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির গল্প। অসম বিধানসভার সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনে রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের মন্ত্রী কেশব মহন্ত যে তথ্য দিয়েছেন, তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র বন্যাতেই অসমে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৩৬ জন।
অন্যদিকে, বন্যা, ভূমিধস, ঝড় ও বজ্রপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত ১২ বছরে রাজ্যটিতে মোট ১,৪৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিধসে ৯৩ জন, ঝড়ে ১৭৫ জন এবং বজ্রপাতে ৩৭২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু মৃত্যুর হিসাব নয়। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি পরিবার, একটি উপার্জনক্ষম মানুষ, একাধিক নির্ভরশীল জীবন এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি। আর এখানেই উঠছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, প্রতিবছর যখন বন্যার পূর্বাভাস থাকে, ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাব্য এলাকাও মোটামুটি চিহ্নিত থাকে, তখন কেন প্রতিবছর একই ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটছে?
বিধানসভায় পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৩ জুলাই পর্যন্ত চলতি বছরে বন্যায় ৪৭ জন, ঝড়ে ৮ জন এবং বজ্রপাতে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শুধু বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৯-এ। অর্থাৎ, বর্ষার মাঝপথেই যদি মৃত্যুর সংখ্যা এতটা বাড়ে, তাহলে পুরো বর্ষা শেষে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বন্যার জল নামার পরও বিপদ শেষ হয় না। জলবন্দি মানুষের সামনে তখন শুরু হয় অন্য লড়াই বিশুদ্ধ পানীয় জল, খাদ্য, চিকিৎসা, স্যানিটেশন, শিশুদের নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের লড়াই। অনেক পরিবারের সামনে থাকে ঘর পুনর্নির্মাণ ও জীবিকা ফিরিয়ে আনার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতি বছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত অসমের জন্য এসডিআরএফ খাতে ৩,৭৯৩.৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত ৩,৪৭৭.২৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের শুরুতে সরকারের হাতে এসডিআরএফ খাতে প্রায় ১,৬০০ কোটি টাকা মজুত থাকার কথাও জানানো হয়েছে।
এসডিএমএফ খাতেও রয়েছে বিপুল অর্থের হিসাব। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত অসমের জন্য এই খাতে ৯৪৮.৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের মোট ৫৯৬.৬০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। ২০২৫-২৬ পর্যন্ত প্রায় ৭৬৩ কোটি টাকার প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের শুরুতে এসডিএমএফ খাতে সরকারের হাতে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা থাকার তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবর্ষে এসডিআরএফ খাতে ৮৪৩ কোটি টাকা এবং এসডিএমএফ খাতে ২১১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এত বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের পরও যদি প্রতিবছর একইভাবে বন্যা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, দুর্যোগ মোকাবিলার অর্থ কি মূলত বন্যার পর ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণেই সীমাবদ্ধ থাকছে, নাকি বন্যার স্থায়ী ঝুঁকি কমাতে যথেষ্ট বিনিয়োগ হচ্ছে? বন্যার পরে ত্রাণ বিতরণ অত্যন্ত জরুরি।
কিন্তু শুধু ত্রাণ দিয়ে অসমের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ ও বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ, নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহের সুরক্ষা, জলাধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, জলনিকাশি ব্যবস্থা, ভাঙনপ্রবণ এলাকার সুরক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে জেলা-ভিত্তিক বন্যা ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করা জরুরি। কারণ বন্যার সঙ্গে লড়াই মানে শুধু জল নামার অপেক্ষা করা নয়, বরং জল আসার আগেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারও মৃত্যু হলে এসডিআরএফ-এর আইটেমস অ্যান্ড নর্মস অফ অ্যাসিস্ট্যান্স। অনুযায়ী মৃতের পরিবারকে ৪ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
চলতি বছরে এই সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে বিপর্যস্ত পরিবারের জন্য এই অর্থ তাৎক্ষণিক সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের জীবন, একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য কিংবা একজন সন্তানের অভিভাবককে হারানোর ক্ষতি কি কোনও অর্থে পূরণ করা সম্ভব? তাই ক্ষতিপূরণ অবশ্যই দরকার, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মৃত্যু ঠেকানোর ব্যবস্থা।
অসমের বন্যা নতুন কোনও সমস্যা নয়। ব্রহ্মপুত্র ও তার উপনদীগুলির সঙ্গে রাজ্যের মানুষের সম্পর্ক বহু পুরনো। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদীর গতিপথের পরিবর্তন, নদীভাঙন, ভূমিস্খলন এবং জনবসতির বিস্তার সব মিলিয়ে বন্যার পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। তাই এখন সময় এসেছে বন্যাকে শুধু ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক, পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত সংকট হিসেবে মোকাবিলা করার।
প্রতিবছর বরাদ্দ, প্রতিবছর ত্রাণ, প্রতিবছর ক্ষতিপূরণ এবং প্রতিবছর মৃত্যুর হিসাব এই চক্রের অবসান ঘটাতে না পারলে অসমের বন্যা মানুষের কাছে চিরস্থায়ী অভিশাপ হয়েই থাকবে। প্রশ্ন তাই একটাই, আর কত মৃত্যু, আর কত পরিবার নিঃস্ব হলে বন্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য যথেষ্ট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা তৈরি হবে? অসমের মানুষের এখন আর শুধু ত্রাণ নয়, নিরাপদ জীবন ও স্থায়ী সমাধানের নিশ্চয়তা প্রয়োজন।





