মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে শহর সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্ষতিপূরণ রেলওয়ে মাঠের আধুনিকীকরণসহ একাধিক রূপরেখা তুলে ধরলেন বিধায়ক
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২মেঃ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে বদরপুরের পরিচয়কে নতুন মাত্রা দিতে শহরের নাম পরিবর্তন করে ‘সিদ্ধেশ্বর ধাম’ করার প্রস্তাব ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বদরপুর শহরের প্রশাসনিক সীমানা বৃদ্ধি, পুরসভা সম্প্রসারণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কৃত্রিম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং রেলওয়ে খেলার মাঠের আধুনিকীকরণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি ও উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বদরপুরের বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ।
সম্প্রতি বদরপুরে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিধায়ক জানান, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের একটি বড় অংশ বদরপুর শহরের নাম পরিবর্তন করে সিদ্ধেশ্বর ধাম রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন। এলাকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই নামকরণ করা হলে বদরপুরের একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে উঠবে বলে তিনি মনে করেন। সেই দাবির প্রেক্ষিতেই বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আনা হয়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ বলেন, বদরপুর শুধু একটি ঐতিহাসিক শহর নয়, এটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শহরের পরিচিতিকে আরও সুদৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে ‘সিদ্ধেশ্বর ধাম’ নামকরণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। শুধু নাম পরিবর্তন নয়, বদরপুর শহরের সামগ্রিক উন্নয়নকে সামনে রেখে প্রশাসনিক পরিসর বৃদ্ধির পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে ১১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত বদরপুর পুরসভাকে সম্প্রসারণ করে পার্শ্ববর্তী কাটিগড়া এলাকার সংলগ্ন কয়েকটি অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হয়েছে।
বিধায়কের মতে, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়ণের ফলে বর্তমান পুরসভার পরিধি শহরের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট নয়। ফলে নাগরিক পরিষেবা আরও কার্যকর ও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দিতে পুরসভা সম্প্রসারণ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্ধিত পুরসভা গঠিত হলে নতুন নতুন এলাকায় রাস্তা, নিকাশি ব্যবস্থা, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা পরিষেবার উন্নয়ন ঘটবে। পাশাপাশি পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের পথও সুগম হবে।
বদরপুরকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত শহরে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে একটি বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (ডিপিআর) তৈরির বিষয়েও মুখ্যমন্ত্রী নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন বলে জানান বিধায়ক। তিনি বলেন, শহরের রাস্তা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলনিকাশী, সৌন্দর্যায়ন, বাজার অবকাঠামো, পার্ক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হবে। এই ডিপিআর বাস্তবায়িত হলে বদরপুরের সামগ্রিক চেহারায় আমূল পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সম্প্রতি টানা ভারী বর্ষণের ফলে বদরপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও কৃত্রিম বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বহু পরিবারের ঘরে জল ঢুকে ইনভার্টার, ফ্রিজ, আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় মূল্যবান সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বিধায়ক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দুর্ভোগের বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়েছে। ইতিমধ্যেই বদরপুরের সার্কল অফিসারকে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত মূল্যায়ন করে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, যারা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তাদের সমস্যার কথা সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব পাওয়ার পর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও ক্ষতিপূরণের আশ্বাসকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। বদরপুরের ক্রীড়াপ্রেমী যুবসমাজের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল রেলওয়ে খেলার মাঠের আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন। সেই দাবিকেও গুরুত্ব দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ।
তিনি জানান, উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ মাঠটির উন্নয়ন, সৌন্দর্যায়ন এবং খেলোয়াড়দের জন্য আধুনিক ক্রীড়া পরিকাঠামো গড়ে তোলার ব্যাপারে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে। বিধায়কের বক্তব্য, খুব শীঘ্রই বদরপুর রেলওয়ে মাঠ নতুন রূপে সজ্জিত হবে। স্থানীয় ক্রীড়াবিদ ও যুবকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়ার সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি হলে জাতীয় স্তরের খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রেও এই মাঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বদরপুরের নাম পরিবর্তন থেকে শুরু করে পুরসভা সম্প্রসারণ, নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা, বন্যা-ক্ষতিপূরণ এবং ক্রীড়া অবকাঠামোর উন্নয়ন সব মিলিয়ে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এলাকার বাসিন্দাদের মতে, ঘোষিত পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়িত হলে বদরপুর শুধু প্রশাসনিক বা বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং ধর্মীয় পর্যটন, ক্রীড়া এবং নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দক্ষিণ আসামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে। এখন নজর সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ঘোষিত পরিকল্পনাগুলির বাস্তবায়নের দিকে।





