জন্মমাটিতে ফিরে ক্যানসার প্রতিরোধের ৩ মূলমন্ত্র শোনালেন ক্যামব্রিজ রিজিওনাল কলেজের ড. ফজলুর রহমান
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২২ আগষ্টঃ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আজ মারাত্মক স্বাস্থ্য সংকটের মুখে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও ক্ষতিকর অভ্যাসের জোয়ারে ভেসে এই অঞ্চল এখন ক্যানসারের অন্যতম বড় ‘হটস্পট’ বা আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। সময় থাকতে এখনই সচেতন না হলে বিপদ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে! বদরপুরের ঐতিহ্যবাহী নবীনচন্দ্র কলেজের আভ্যন্তরীণ গুণমান নিশ্চিতকরণ কোষ (আইকিউএসি)এর ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত ক্যানসার সচেতনতা বিষয়ক এক বিশেষ বক্তৃতায় এই বিস্ফোরক ও সময়োপযোগী সতর্কবার্তা উঠে এসেছে।
শুক্রবার আয়োজিত এই সভায় মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বদরপুরেরই কৃতী সন্তান, বর্তমানে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ‘ক্যামব্রিজ রিজিওনাল কলেজ’-এর শিক্ষক তথা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ড. ফজলুর রহমান তালুকদার। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ড. পার্থসারথি দাস।
তিনি তাঁর বক্তব্যে ক্যানসারের সংজ্ঞা ও এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, সমগ্র ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বর্তমানে অন্যতম ক্যানসার প্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্তর থেকেই সচেতনতার প্রসার ঘটানো জরুরি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ইণ্টারন্যাল কোয়ালিটি অ্যাসেসমেন্ট সেল (আইকিউএসি)এর আহ্বায়ক জয়নাল আবেদিন তাপাদার অতিথি বক্তার বর্ণাঢ্য পরিচয় তুলে ধরেন এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ধরণের বৈজ্ঞানিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। ড. ফজলুর রহমান তালুকদারের বক্তৃতার মূল বিষয়বস্তু ছিল, ‘ব্রিজিং দ্য গ্যাপ আন্ডারস্ট্যান্ডিং ক্যানসার রিস্ক ফ্যাক্টরস অ্যান্ড প্রিভেনশন ইন নর্থইস্ট ইন্ডিয়া’। জন্মমাটিতে ফিরে ক্যানসারের ঝুঁকির কারণ ও তা প্রতিরোধের উপায় নিয়ে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন তিনি।
তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান ও গবেষণায় দেখা গেছে যে কেবল ভারতেই নয়, সম্পূর্ণ বিশ্বের দরবারে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ক্যানসারের ভয়াবহ কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এর পেছনে মূলত আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসই দায়ী। ক্যানসারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে ড. তালুকদার চিহ্নিত করেছেন, অনিয়ন্ত্রিত পান-সুপারি জর্দা সেবন, অতিরিক্ত ধূমপান ও মদ্যপানের প্রবণতা। প্রথাগত উপায়ে তৈরি ধূমায়িত বা পোড়ানো মাংস, অতিরিক্ত তেল মসলা এবং শূকরের চর্বি পরিমাণের চেয়ে বেশি গ্রহণ করা। অতিরিক্ত শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার স্থূলতাসহ একাধিক লাইফস্টাইল ডিজিজের পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে ড. ফজলুর রহমান তালুকদার উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে ৩টি নির্দিষ্ট পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন, শরীরের ছোটখাটো অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা লক্ষণকে অবহেলা না করে সচেতন থাকা। পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্ক্রিনিং বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে ‘সারভিক্যাল ক্যানসার’ প্রতিরোধে উপযুক্ত সময়ে টীকাকরণ সম্পন্ন করা। ক্যানসার ছোঁয়াচে নয় বা এটি কোনো অভিশাপ নয়, এই সত্যটা বুঝে বন্ধু, পরিবার ও প্রতিবেশীদের মাঝে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বক্তৃতা শেষে এক জ্যান্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কলেজের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। বিপ্রজ্যোতি রায়, মাসুক আহমেদ সহ একাধিক শিক্ষার্থী ক্যানসারের প্রাথমিক নির্ণয়, জিনগত প্রভাব ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে নিজেদের মনের নানা প্রশ্ন তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে সরাসরি উত্তর পেয়ে আশ্বস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। মনোজ্ঞ এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পাপড়ি দাস। সমাপনী পর্বে উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজিমুদ্দিন খাদিম।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কলা বিভাগের সমন্বয়ক মনজুরুল হক, ড. হেদায়েতুল্লাহ চৌধুরী, ড. নন্দিতা দত্ত, ড. রূপদত্তা রায়, ড. সরোয়ার আলম খান, ড. আফজল হোসেন শেখ, ড. গৌতম চন্দ্র দে, ড. বিপ্রজিৎ নাথ, ড. জয়নাল আবেদিন, এলিজা জাকারিয়া, অন্তরা সাইবা সহ অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ এবং বদরপুর এলাকার বিশিষ্ট নাগরিক এনাম উদ্দিন।






