শিক্ষার বালাই নেই, আইন তৈরিতে মত্ত! অযোগ্যদের হাতে গণতন্ত্রের লাইসেন্স তুলে দেওয়ার কদর্য প্রথার অবসান কবে?
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২২ আগষ্টঃ দেশের শাসনতন্ত্রে নীতিনির্ধারণ এবং আইন প্রণয়নের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব যাঁদের কাঁধে ন্যস্ত, তাঁদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা নিয়ে এবার তীব্র অসন্তোষ ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যেখানে গ্রাম পঞ্চায়েত বা স্থানীয় স্তরের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলেও প্রার্থীর নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সেখানে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা অর্থাৎ বিধানসভা এবং সংসদ নির্বাচনে লড়ার ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন না থাকা এক চরম অসঙ্গতি ও প্রহসন বলেই মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ ও বিশিষ্ট মহল।
যাঁরা দেশের সুদীর্ঘ সংবিধান, জটিল ফৌজদারি আইন (যেমন বিএনএস, বিএনএসএস), বিভিন্ন সরকারি অধ্যাদেশ, নোটিফিকেশন বা প্রশাসনিক নির্দেশিকা (এসওপি) সম্যক উপলব্ধি করার ক্ষমতা রাখেন না, সেই সমস্ত অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তিরা কীভাবে কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন, তা নিয়েই উঠছে মূল প্রশ্ন। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
গণতন্ত্র, ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, দেশের সংবিধান থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার মতো জটিল বিষয়গুলির ন্যূনতম জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও যে কেউ বিধায়ক, সাংসদ, মন্ত্রী বা দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হতে পারছেন।
সমালোচকদের একাংশের মতে, দেশের শাসনক্ষমতায় অদক্ষ ও অশিক্ষিত নেতৃত্বের আধিপত্য থাকার ফলেই উন্নয়ন সঠিক পথে এগোচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন সমীক্ষা বা প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে বলা হচ্ছে, বিশাল জনসংখ্যার এই দেশে সঠিক নীতির অভাবে সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় এবং অর্থনৈতিক প্রগতি আজও কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। জনগণের কষ্টের উপার্জিত ট্যাক্সের অর্থে চলা জনপ্রতিনিধিরা লাখ লাখ টাকা বেতন, পেনশন ও নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও, বিনিময়ে দেশ কাঙ্ক্ষিত প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে না।
পৃথিবীর বহু উন্নত দেশ বহু আগেই তাদের আইনসভার সদস্য বা নীতিনির্ধারক হতে শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি কঠোরভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ইতালি, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, কানাডা এবং আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলির দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানকার প্রতিনিধিরা উচ্চশিক্ষিত এবং তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে যথেষ্ট পারদর্শী।
এমনকি প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও সংসদ সদস্য হতে গেলে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারত আজও সেই মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার ঘেরাটোপেই আটকে রয়েছে। দেশের কিছু রাজ্যে পঞ্চায়েত স্তরে শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি চালু হলেও সংসদ বা বিধানসভায় এখনও পর্যন্ত এই ধরনের কোনো আইনি বাধারপ্রাকার নেই।
স্বাধীনতার দীর্ঘ ৭৯ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের প্রচলিত নির্বাচনী ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
সেই লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর প্রস্তাবও সামনে এসেছে। প্রস্তাবগুলির অন্যতম হল, লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা। এ জন্য সংসদে নতুন আইন প্রণয়ন করে প্রার্থীদের অন্তত স্নাতক বা সমতুল্য ডিগ্রি অর্জন বাধ্যতামূলক করার দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর বিধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দূরশিক্ষণ বা ডিস্টেন্স এডুকেশনের মাধ্যমে অর্জিত ডিগ্রি বৈধ হলে তা গ্রহণযোগ্য থাকবে, তবে জাল সার্টিফিকেট বা ভুয়ো শিক্ষাগত নথি ব্যবহার করে কেউ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হলে, সেই বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর নির্বাচন ও সদস্যপদ বাতিলের বিধান রাখার দাবি জানানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এ ধরনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা সম্পন্ন করার বিধান থাকা উচিত।
শুধু নির্বাচন ও সদস্যপদ বাতিলই নয়, জাল শিক্ষাগত শংসাপত্র ব্যবহারের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থার দাবিও উঠেছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর জন্য ন্যূনতম ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হচ্ছে।
প্রস্তাবকদের মতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের যোগ্যতা, নথির সত্যতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। তবে এ ধরনের পরিবর্তন কার্যকর করতে হলে সংবিধান, বিদ্যমান নির্বাচনী আইন এবং প্রার্থীদের মৌলিক অধিকার সব দিক বিবেচনা করে একটি সুস্পষ্ট ও আইনসম্মত কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন মহল থেকে সংস্কারের দাবি উঠছে। সেই দাবিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল, আইনপ্রণেতা তথা জনপ্রতিনিধি হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করা।
এই দাবিকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার ও জনসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বানও জানানো হচ্ছে। মতটি হল, দেশের আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যাঁরা পালন করবেন, তাঁদের অন্তত একটি নির্দিষ্ট মাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকা উচিত।
তবে আমার মতে, জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের দাবি নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হওয়া দরকার, কিন্তু শুধুমাত্র ডিগ্রিকে একজন প্রার্থীর যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি করা সমীচীন হবে না। একজন দক্ষ জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে শিক্ষার পাশাপাশি তাঁর সততা, জনসম্পৃক্ততা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ, প্রশাসনিক ও সামাজিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান এবং মানুষের সমস্যা বোঝার সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে প্রার্থীদের শিক্ষাগত ও অন্যান্য যোগ্যতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ভুয়ো বা জাল শংসাপত্র ব্যবহার করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা থাকা উচিত। এতে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সুতরাং, জনপ্রতিনিধিদের যোগ্যতা ও দক্ষতার একটি সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের দাবি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সেই মানদণ্ড যেন কেবল শিক্ষাগত ডিগ্রিনির্ভর না হয়ে জ্ঞান, দক্ষতা, সততা, জনসেবা ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার সমন্বিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি হয়। গণতন্ত্রে শিক্ষিত নেতৃত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা। এই ভারসাম্য বজায় রেখেই নির্বাচনী সংস্কারের পথ নির্ধারণ করা উচিত।





