চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ)-র বাধার মুখে ভারতীয় সেনা, বিস্ফোরক রিপোর্ট ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং টিমের
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ ডোকলাম থেকে লাদাখ—উত্তর সীমান্তে চীনের সাথে অচলাবস্থার ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। ঠিক সেই মুহূর্তেই অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির চাতুর্যপূর্ণ এবং ধারাবাহিক আগ্রাসনের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এল। মাঠপর্যায়ের সরেজমিনে তৈরি একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং টিমের বিস্ফোরক রিপোর্ট অনুযায়ী, অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি জেলার তকসিং সংলগ্ন অঞ্চলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর টহলদার দলকে তাদের নির্ধারিত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোলিং পয়েন্টগুলোতে যেতে বাধা দিচ্ছে চীনা সেনারা। এই রিপোর্ট সামনে আসতেই সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভারতের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের ঝড় উঠেছে।
অরুণাচল টাইমস এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন এলাকায় চীনা সেনার আধিপত্য বিস্তারের কৌশল কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের বহু পুরোনো ‘স্লাইসিং’ বা ধীরে ধীরে জমি দখলের কৌশলের অংশ। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্থানীয় ভারতীয় গ্রামবাসীদের ঐতিহ্যবাহী চারণভূমি এবং শিকারের এলাকাগুলোতে পিএলএ ক্রমান্বয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে পিপলস পার্টি অফ অরুণাচল চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং বা তথ্য-অনুসন্ধানী দল গঠন করেছিল। এই দলে ছিলেন অরুণাচলের প্রাক্তন মন্ত্রী কাহফা বেঙ্গিয়া, পিপিএ-সহ-সভাপতি কলিং জেরাং, সাধারণ সম্পাদক সোরাং কিওকম এবং বিশিষ্ট নেতা নরাহ জিমির মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ।
কমিটির সদস্যরা গত ১০ জুলাই সরাসরি সীমান্তসংলগ্ন তকসিং, মাজা এবং গ্যালেমো এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখানে মোতায়েন থাকা উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা, জওয়ান এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনার পর তারা যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক, প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘শেরা ৫ পয়েন্ট’ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্ধারিত পেট্রোলিং পয়েন্ট। স্থানীয় সূত্র ও সীমান্তবাসীদের দাবি, বর্তমানে এই পয়েন্টটিতে ভারতীয় টহলদার দলকে যেতে দিচ্ছে না পিএলএ।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে এই নির্দিষ্ট পয়েন্টেই ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে একটি বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেছিল। এর পর কৌশলগত কারণে ভারতীয় সেনা সেখান থেকে সাময়িকভাবে পিছু হটলেও আর পূর্বের স্থানে ফিরতে পারেনি। অভিযোগ উঠেছে, খালি সুযোগ পেয়ে চীনা পিএলএ সেনারা সেখানে প্রবেশ করে ভারতের তৈরি সমস্ত স্থায়ী মার্কার বা সীমানা চিহ্ন উপড়ে ফেলে দিয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে নাঙ্গা পাহাড় এলাকাটি স্থানীয় নাহ্ এবং মারা সম্প্রদায়ের উপজাতি মানুষের শিকার ও চামরী গাই পালনের প্রধান কেন্দ্র ছিল। ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটির দাবি, বর্তমানে এই বিশাল অঞ্চলটিকে স্থানীয় ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ‘সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে। কমিটির ভাষায়, স্থানীয়দের প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পিএলএ সেখানে অবাধে চলাচলের নজিরবিহীন স্বাধীনতা পেয়ে গেছে।
অনুপ্রবেশের এই ছক অত্যন্ত চিন্তা-ভাবনা করে, ধীরগতিতে এবং ধারাবাহিকভাবে চালানো হচ্ছে, যা গত কয়েক দশক ধরে চীনের গ্রহণ করা সুনির্দিষ্ট কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি। অবশ্য সীমানার এই টানাপোড়েন নতুন নয়। জুন মাসের শেষের দিকে ‘নাহ্ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ নামের একটি স্থানীয় আদিবাসী সংগঠনও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ জানিয়েছিল যে, তকসিংয়ের আশপাশে তাদের ভিটেমাটি ও চারণভূমিতে পিএলএ তাদের ঘাঁটি চওড়া করছে।
তবে এই সমস্ত দাবি ও রিপোর্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে নাকচ করে দিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। সেনার পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশে চীনা অনুপ্রবেশ কিংবা চীনা সামরিক ক্যাম্প স্থাপনের যেসব খবর প্রকাশ্যে আসছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং অসত্য। একই সুর শোনা গেছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রেমা খান্ডুর গলায়। গত ৮ আগস্ট এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, অরুণাচলে কোনো ধরনের সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি।
আমাদের সেনাজওয়ানরা অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে ২৪ ঘণ্টা সীমান্তে নজরদারি চালাচ্ছেন এবং ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করছেন। সেনা ও প্রশাসনের এই অস্বীকার সত্ত্বেও রাজনৈতিক উত্তাপ কমেনি। ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্টের তথ্য সামনে আসতেই কেন্দ্র সরকারকে নিশানা করেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন প্রধান তথা হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়েসি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ (টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে ওয়েসি লিখেছেন, নরেন্দ্র মোদী সরকারের উচিত অরুণাচল সীমান্তে বাস্তবে কী ঘটছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা না রেখে দেশের মানুষের সামনে সত্য প্রকাশ করা। সরকার এখন পর্যন্ত যা তথ্য দিয়েছে তা অত্যন্ত অপ্রতুল এবং আসল সত্য ঢেকে রাখার প্রয়াস মাত্র।
ডোকলাম এবং পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকার দীর্ঘ অচলাবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওয়েসি বলেন, ভারতীয় জওয়ানদের যদি নিজস্ব পেট্রোলিং পয়েন্টে যেতে বাধা দেওয়া হয় এবং চীনা সেনা যদি সেখানে তাবু খাটিয়ে বসে থাকে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশ আর নতুন কোনো ডোকলাম বা লাদাখ দেখতে চায় না।
এই সীমান্ত উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন সম্প্রতি চীন অরুণাচলের ২৭টি বিভিন্ন ভৌগোলিক স্থান ও নদীর নিজস্ব নামকরণ করে একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। ভারত অবশ্য কঠোর ভাষায় চীনের সেই দাবি উড়িয়ে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও সার্বভৌম অংশ ছিল, আছে এবং চিরকাল থাকবে। বেইজিংয়ের কাল্পনিক নামকরণে বাস্তব পাল্টে যায় না।
কিন্তু কূটনৈতিক টেবিলে ভারতের এই কড়া বার্তা এবং সীমান্তে পিএলএ-র এই প্ররোচনামূলক বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক দেখা যাচ্ছে বলে দাবি কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের। সব মিলিয়ে, তকসিং ও সুবানসিরি উপত্যকার এই বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি আঞ্চলিক সীমান্ত বিতর্ক নয়, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা এনে দাঁড় করিয়েছে।





