দিখৌর পরিণতির পথে কালাইনছড়া-বলেশ্বর-সিন্দুরা! ধ্বংসের মুখে কাটিগড়ার একাধিক গ্রাম

বড়াইল অভয়ারণ্যের সবুজ বুক চিরে নেমে আসা এই নদীগুলো কেবল কোনো জলধারা ছিল না, এগুলো ছিল পুরো কাটিগড়াসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পরিবেশগত সুরক্ষাকবচ, কৃষির ধমনী এবং লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। কিন্তু গত দুই দশকে লুটেরাদের লোভ আর বেপরোয়া বালি-পাথর মাফিয়াদের অনিয়ন্ত্রিত থাবায় নদীগুলোর স্বাভাবিক পথ অবরুদ্ধ। বড়াইলের বুক চিড়ে যেভাবে নদীর গর্ভ ফাঁকা করা হচ্ছে, তাতে নদীগুলো আজ একেকটি বিশালাকার কঙ্কালে পরিণত হয়েছে।

অবৈধ খনন, জেসিবি ও ড্রেজারের নৃশংস গর্জন, এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পাল্টে দেওয়ার এই অবাধ বাণিজ্য শুধু নদীকেই মারছে না, মারছে এলাকার ভবিষ্যৎকেও। সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড়ি ঢলের তাণ্ডব, বাঁধ ভাঙা বন্যা, আর ভয়াবহ ভূমিক্ষয় আজ কাটিগড়ার নিত্যদিনের সঙ্গী। অথচ, যাদের দায়িত্ব ছিল এই পরিবেশগত সুরক্ষাকবচ রক্ষা করার, সেই প্রশাসন যেন এক গভীর, সন্দেহজনক নিদ্রায় আচ্ছন্ন!

একটি নদীকে ধীরে ধীরে হত্যা করলে তার চরিত্র কতটা নৃশংস হয়ে উঠতে পারে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ শিবসাগরের দিখৌ নদী। দিখৌর প্রলয়ঙ্করী বন্যায় পুরো জনপদ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পেছনে প্রকৃতির চেয়েও বড় অনুঘটক ছিল অসাধু মাফিয়াদের অনিয়ন্ত্রিত পাথর, বালি ও কয়লা লুণ্ঠন। আজ ঠিক একই ভয়াবহ চিত্রনাট্য লেখা হচ্ছে কালাইনের বুকে। প্রশ্ন উঠেছে, কালাইনের এই তিনটি নদী কি তবে মাফিয়ারাজ আর প্রশাসনিক দুর্নীতির বলি হয়ে ধ্বংসের শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেছে? নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কালাইনছড়া, বলেশ্বর ও সিন্দুরার রূপ ছিল অন্যরকম। বর্ষায় পাহাড় থেকে ধেয়ে আসা দুরন্ত পাহাড়ি ঢলকে শান্ত করতো নদীর বুকের প্রকাণ্ড সব পাথরের চাঁই।

এই বিশালাকার পাথর, নুড়ি আর বালির স্তর ছিল প্রকৃতির নিজস্ব স্পিড ব্রেকার বা শোষক। স্থানীয় শ্রমিকরা হাতুড়ি, খুন্তি আর শাবল দিয়ে প্রয়োজনমতো পাথর-বালি কুড়াতেন। নদী তার স্বাভাবিক ছন্দ হারাত না, মানুষের পেটেও ভাত জুটতো প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে ছিল এক অপূর্ব ভারসাম্য। কিন্তু নয়ের দশকের শেষভাগ থেকে উন্নয়ন এর নতুন জোয়ার শুরু হতেই এই পাহাড়ি নদীগুলোর ওপর কুদৃষ্টি পড়ে মুনাফালোভী ব্যবসায়ী মহলের।

রাস্তাঘাট, সেতু আর বহুতল নির্মাণের জন্য পাথর ও বালির চাহিদা আকাশ ছুঁলে কালাইনের নদীগুলো পরিণত হয় লাভজনক খননক্ষেত্রে। বৈধ ইজারার আড়ালে গজিয়ে ওঠে একটি সর্বগ্রাসী মহালদার, ব্যবসায়ী-পাথর-বালি সিন্ডিকেট’। আর এদের অকৃপণ সহযোগিতায় এগিয়ে আসে কালাইন বন বিভাগের একশ্রেণির অসাধু ও দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিক।

একসময় যে কাজ হাতে হতো, সেখানে আজ নামানো হয়েছে দানবীয় ভারী যন্ত্রপাতি। পরিবেশগত বিধিনিষেধ ও নদীর সহনশীলতার তোয়াক্কা না করে দিন-রাত প্রকাশ্যে চালানো হচ্ছে পকেট ভরার মহোৎসব। দিনের আলোয় তো বটেই, প্রশাসনিক নজরদারি শিথিল হওয়ার সুযোগ নিয়ে রাতের অন্ধকারে নদীর পেটের ভেতর নামিয়ে দেওয়া হয় বিশাল বিশাল এক্সক্যাভেটর ও ডাম্পার।

নদীর গভীর তলদেশ চিরে তুলে নেওয়া হচ্ছে শতাব্দীর জমে থাকা বালির স্তর। নদীকে আগলে রাখা বিশালাকার পাথরের চাঁইগুলোকে ভারী যন্ত্র দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি নদীর তীরবর্তী পাহাড়ের ঢাল কেটে মাটি ও পাথর উপড়ে ফেলা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। সংগৃহীত পাথর ও বালি কেবল স্থানীয় কাজে ব্যবহার হচ্ছে না, রাতের আঁধারে শত শত ওভারলোডেড ডাম্পারে চাপিয়ে তা পাচার হয়ে যাচ্ছে বহিঃরাজ্যে। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, নদীর বুকের এই লুণ্ঠন শুধুই পাথর তোলা নয়, এ হলো নদীর ‘হাইড্রোলাইক জিওমেট্রি’বা জলীয় শারীরস্থানকে কৃত্রিমভাবে বিকল করে দেওয়া। যার সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

ভূতত্ত্ববিদ ও নদীবিজ্ঞানীদের মতে, তলদেশ থেকে অনিয়ন্ত্রিত বালি ও পাথর তুলে নিলে নদীর স্বাভাবিক ঢাল এবং স্রোতের গতিবেগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আজ অল্প বৃষ্টিতেই কালাইনছড়া, বলেশ্বর ও সিন্দুরার জল ফুলে-ফেঁপে ওঠে। তলদেশের পাড় ধসে হাজার হাজার বিঘা কৃষিজমি নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। সরকারের কোটি কোটি টাকায় নির্মিত সেতু আজ ভেঙে পড়ার মুখে, সংযোগকারী রাস্তা ধসে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে বারবার।

অথচ কালাইন বন বিভাগ ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকা। সচেতন নাগরিক সমাজ আজ সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন, বন বিভাগের এই নি নিশ্চুপতা কি শুধুই ব্যর্থতা, নাকি গভীর কোনো আর্থিক আঁতাতের যোগসাজশ? নদী আর পাহাড়ের চেহারা চোখের সামনে বদলে গেল, দিন-রাত ভারী যানের বিকট শব্দে কালাইনের আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠলো, আর বন বিভাগের বিট অফিসার থেকে শুরু করে রেঞ্জারের চোখে তা ধরা পড়লো না?

এটা কি অন্ধত্ব, নাকি অর্থের বিনিময়ে চোখ বুজে থাকার সুচতুর অভিনয়? সরকারি ইজারা মানেই কি নদীকে পুরোপুরি হত্যা করার লাইসেন্স? একটি মহাল থেকে কতটুকু পাথর-বালি তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে? বাস্তবে কতটুকু তোলা হচ্ছে? পরিমাপ কে করছে? পরিবেশগত শর্তাবলী কি আদেও মানা হচ্ছে? এই সমস্ত তথ্যের কোনো স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে কেন নেই? জনরোষ চরম আকার ধারণ করলে বা মিডিয়ায় শোরগোল হলে বন বিভাগ দু-একদিন লোকদেখানো অভিযান চালায়। দু-একটি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করে সংবাদমাধ্যমে মুখ দেখায়। তারপর কিছুদিন যেতেই আবার যেমন কে তেমন! প্রশ্ন হচ্ছে, এই সাময়িক লোকদেখানো অভিযান কি শুধুই ধুলোবালি ছেটানো নাটক?

ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রিম কোর্ট এবং পরিবেশ মন্ত্রকের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে যে ইকো-সেনসিটিভ জোন ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশেপাশে কোনো ধরনের ভারী যন্ত্র চালানো বা অনিয়ন্ত্রিত খনন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু কালাইন বন বিভাগের নাকের ডগায় কীভাবে এই নির্দেশিকাগুলোকে প্রতিনিয়ত বুড়ো আঙুল দেখানো হচ্ছে? স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বহুবার জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ এবং পুলিশি ব্যবস্থার দরজায় কড়া নেড়েছেন। স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে, প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে, এমনকি আইনি লড়াইও লড়া হয়েছে।

কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কারণ একটাই, পাথর-বালি মাফিয়া, কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার হাত এতটাই মজবুত যে, আইনের ফাঁক গলে তারা প্রতিবার পার পেয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের লাভের খাতা প্রতিদিন মোটা হচ্ছে, আর কালাইনের সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষক তার জমি হারাচ্ছে, ছাত্র-ছাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত সেতু পার হতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে, আর বর্ষা এলে হাজার হাজার পরিবার আতঙ্কে রাত জাগছে।

এই পরিস্থিতি যদি অবিলম্বে বন্ধ করা না হয়, তবে কালাইনের মানুষকে প্রকৃতির চরম প্রতিশোধের মুখোমুখি হতে হবে। লোকদেখানো লোকভুলানো প্রতিশ্রুতি বন্ধ করে প্রশাসনকে অবিলম্বে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, ইকো-সেনসিটিভ জোনে অবৈধ খননের অভিযোগ তদন্ত করতে বন বিভাগ, খনি ও ভূতত্ত্ব দপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এক নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

কেবল সামান্য টাকার বিনিময়ে গাড়ি চালানো চালক বা দিনমজুর শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে নাটক সাজালে চলবে না। পাথর-বালি সিন্ডিকেটের আসল নিয়ন্ত্রক, অর্থ যোগানদাতা এবং এদের আড়াল করা দুর্নীতিগ্রস্ত বন কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে ‘প্রিভেনশন অব করাপশন অ্যাক্ট’ ও পরিবেশ সুরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করতে হবে।

যেসব মহালদার ইজারার শর্ত ও সীমানা লঙ্ঘন করে নদীর বুক চিরে খনন চালিয়েছে, তাদের ইজারা অবিলম্বে বাতিল করে আজীবনের জন্য কালো তালিকাভুক্ত (করতে হবে। নদীর মহাল সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য, অনুমোদিত এলাকা, উত্তোলনের পরিমাণ, রাজস্বের হার ও পরিদর্শন রিপোর্ট জনসমক্ষে টাঙিয়ে দিতে হবে। নদী কোনো নির্দিষ্ট মাফিয়া বা রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। নদী একটি জনপদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া আমানত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার।

আজ যদি কালাইনছড়া, বলেশ্বর ও সিন্দুরার বুক থেকে লোভের বশবর্তী হয়ে শেষ পাথরটি তুলে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে কাল যখন প্রলয়ঙ্করী ঢল নেমে আসবে, সেদিন এই ব্যবসায়ীরা কোটি টাকার গাড়ি চেপে শহরে পালিয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু কালাইনের নদীপাড়ের সাধারণ মানুষকে ভেসে যেতে হবে নিখোঁজ স্রোতে। কালাইন বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসন কি এখনও ঘুমের ভান করে থাকবে? নাকি প্রকৃতি তার নিজ হাতে ন্যায়বিচার করার আগেই অবৈধ খননের এই বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলবে? উত্তর কালাইনের লাখো মানুষ আজ সরকারের কাছে কড়ায়-গণ্ডায় চায়!

Related Posts

তুঘলক ক্রিসেন্টের বাংলোয় সেই রাতের পোড়া নোটের রহস্য, তদন্তে কাঠগড়ায় বিচারপতি বর্মা

অগ্নিকাণ্ডের পর মিলেছিল বিপুল নগদ, পরে রহস্যজনকভাবে উধাও; তিন অভিযোগই সত্য বলে জানাল তদন্ত কমিটি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ বাইরে থেকে দেখলে দিল্লির তুঘলক ক্রিসেন্টের ৩০ নম্বর সরকারি…

সাবান-বিস্কুটেও মূল্যবৃদ্ধির আঁচ, সেপ্টেম্বরে আরও চাপে মধ্যবিত্তের সংসার

কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচের অজুহাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তুতিতে একাধিক এফএমসিজি সংস্থা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ রান্নাঘরের গ্যাস থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধিতে এমনিতেই চাপে সাধারণ মানুষের সংসার। এর…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *