বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ নিজেকে কাছাড় জেলা আমসু সভাপতি পরিচয়ে দাপিয়ে বেড়ানো জাহানুর আলম মজুমদারের ক্ষমতার আসফালন অবশেষে গিয়ে থামল জেলখানার চার দেয়ালের ভেতর। সোনাই থানার পুলিশ আদালতের নির্দেশে তাঁকে গ্রেফতার করে বিচারিক বিভাগে সোপর্দ করলে আদালত সরাসরি তাঁকে জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু এই গ্রেফতারির পর কাছাড়ের সচেতন নাগরিক মহলে একটাই প্রশ্ন উকি দিচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে একশ্রেণীর স্বঘোষিত নেতা কীভাবে এতদিন ধরে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে খাওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন?
পুলিশি ও আদালতের সুনির্দিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোনাই থানার অন্তর্গত নগদীরগ্রাম প্রথম খণ্ডের ডেপলিপার গ্রামের বাসিন্দা জাহানুর আলমকে PRC/1531/2023 নম্বর মামলার ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাটি সোনাই থানার মামলা No. 101/2023-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৪২ (বেআইনিভাবে কাউকে আটকে রাখা) এবং ৩৮৬ (মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় বা তোলাবাজি)-র মতো জামিনঅযোগ্য ও গুরুতর ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
আদালতের নথি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, অভিযুক্ত জাহানুর আলম দীর্ঘদিন ধরেই বিচার প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন। ১ জুলাই ২০২৬ এর শুনানিতে তিনি আদালতে অনুপস্থিত থাকেন। তাঁর আইনজীবী সময় চেয়ে আবেদন জানালেও কাছাড়ের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তা খারিজ করে দেয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অ-জামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা বহাল রাখে। সেই নির্দেশের ওপর ভিত্তি করেই সোনাই থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে মামলাটি অ্যাপিয়ারেন্স বা হাজিরা পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে উপত্যকা জুড়ে এক শ্রেণীর সুযোগসন্ধানী লোক কোনো বৈধ ভিত্তি ছাড়াই নিজেদের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বা সম্পাদক বলে দাবি করে বেড়াচ্ছে। জাহানুর আলমও নিজেকে ‘কাছাড় জেলা আমসুর সভাপতি’ পরিচয় দিয়ে নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার জাঁকজমক দেখাতেন।
সচেতন মহলের অভিযোগ, এই ধরনের তথাকথিত স্বঘোষিত পদবি কোনো সামাজিক সেবার জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, জমি জবরদখল ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর এক মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জাহানুর আলমের মতো ব্যক্তিদের পেছনে কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা সামাজিক চক্রের ছায়া রয়েছে কি না, তা নিয়েও তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহানুর আলমের বিরুদ্ধে তোলাবাজি ছাড়া জমি জবরদখল, ডাকাতি, পথ আটকে মারধর সহ প্রায় ১০টিরও বেশি একাধিক ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। সাধারণ মানুষের বক্তব্য, একের পর এক অপরাধের সঙ্গে নাম জড়ানো সত্ত্বেও কীভাবে তিনি এতদিন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতেন এবং সামাজিক পরিচয় ব্যবহার করতেন? আদালতের বিচারে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনিভাবে এসবই ‘অভিযোগ’ হিসেবে গণ্য হলেও, একই ব্যক্তির নামে একগুচ্ছ ফৌজদারি মামলা থাকা পুরো এলাকার সামাজিক নিরাপত্তার ওপর এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে।
স্থানীয় বাসিন্দারা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই ধরণের অসামাজিক ও তোলাবাজ চক্রকে উপত্যকা থেকে নির্মূল করতে হলে কেবল একটি মাত্র মামলায় গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়। তাঁদের দাবি, আমসু কেন্দ্রীয় কমিটির উচিত দ্রুত সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে স্পষ্ট করা যে জাহানুর আলম আদৌ তাঁদের সংগঠনের স্বীকৃত পদাধিকারী ছিলেন কি না। যদি না হন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানোর দায়েও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
জাহানুর আলমের বিরুদ্ধে থাকা বাকি ১০টি মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে চার্জশিট জমা দিক পুলিশ। স্বঘোষিত নেতাদের নাম ভাঙিয়ে যারা সোনাই ও কাছাড়ের বিভিন্ন প্রান্তে অসাধু কাজ চালাচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে কড়া শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কাছাড় জেলা আদালতে আসাম রাজ্যের পক্ষ থেকে তোলাবাজি ও অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের এই নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। এখন দেখার, ৯ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে আদালতের পক্ষ থেকে কী নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং পুলিশ এই স্বঘোষিত নেতার অন্যান্য অপকর্মের জট কতটা খুলতে পারে।






