নিজেদের শোধরান, নইলে রাজপথে আন্দোলনে নামব, মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তোপ বাবা রামদেবের
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৫ আগষ্টঃ হাওয়ার গতি যে বদলাচ্ছে, তা বুঝতে কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর প্রয়োজন পড়ে না, যোগগুরু বাবা রামদেবের সাম্প্রতিক বিস্ফোরক মন্তব্যে সে কথা আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল। যে রামদেব একসময় বর্তমান শাসকদলের অঘোষিত ‘পোস্টার বয়’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, সেই রামদেবই হঠাৎ নিজের সুর সম্পূর্ণ বদলে ফ্লেক্স-ব্যানারের চকচকে রাজনীতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম বাস্তবতাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করলেন। সরকারি চাকরিতে প্রকাশ্য নিলাম, সর্বব্যাপী ঘুষের দৌরাত্ম্য এবং শিক্ষাব্যবস্থার করুণ অবস্থা নিয়ে সোচ্চার হয়ে তিনি সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, নিজেদের শোধরান, তা না হলে বাবা রামদেবকে আবার রাজপথে আন্দোলনে নামতে হবে!
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পতঞ্জলি যোগপীঠে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর এই মন্তব্য দেশজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তাঁর পাশে পতঞ্জলি যোগপীঠের মহাসচিব আচার্য বালকৃষ্ণ সহ বহু সাধক উপস্থিত থাকলেও, রামদেবের মুখে ছিল শুধুই সরকারের নীতি ও দেশের বর্তমান ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা।
ঝাড়খণ্ডের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন জোগাতে গিয়ে দেশের সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন স্বামী রামদেব। ইন্টারভিউ ও ভাইভা বোর্ডগুলিকে দুর্নীতির কারখানা হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন: সরকারি চাকরিতে সাক্ষাৎকারের সময় প্রায় ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই ভয়াবহ দুর্নীতি হচ্ছে। যোগ্যতা বা মেধার স্থান নেই, আগে থেকেই দরদাম হাঁকিয়ে লক্ষ লক্ষ ও কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে চাকরি বিলি করা হচ্ছে।
নিজের জাতি, বিশেষ সম্প্রদায় এবং দলীয় মতাদর্শের লোকেদের অন্যায্যভাবে চাকরি পাইয়ে দিয়ে যোগ্য ও সাধারণ পরীক্ষার্থীদের অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে। একদিকে মুখে ‘সত্যমেব জয়তে’ স্লোগান হাঁকানো হচ্ছে, আর অন্যদিকে পর্দার আড়ালে চরম অপকর্ম চলছে। এই অপমানজনক ব্যবস্থা ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একদম মূল গোড়ায় আঘাত হানছে।
দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন যোগগুরু। তিনি চাঁচাছোলা ভাষায় দেশের তৃণমূল শিক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চিত্রটি ফুটিয়ে তোলেন, প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকার ছোট ছোট স্কুল-কলেজগুলিতে পানীয় জল, বিদ্যুতের সংযোগ, পরিচ্ছন্ন শৌচালয় এবং পর্যাপ্ত শিক্ষকের মতো মৌলিক সুবিধাও নেই। বাধ্য হয়ে ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হচ্ছে।
যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম পরিকাঠামো বা শিক্ষক রয়েছে, সেখানে আবার নিয়মিত প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ব্যাপক টুকাটুকির উৎসব চলছে। শিক্ষা ব্যবস্থার এই দ্বৈত অরাজকতা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শুধু দুর্নীতি বা শিক্ষাই নয়, দেশের বর্তমান বিষাক্ত রাজনৈতিক আবহ নিয়েও তোপ দাগেন রামদেব। সংসদের ভেতরের কাদা ছোঁড়াছুড়িকে তীব্র কটাক্ষ করে তিনি বলেন, আজ দেশের শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যকার সম্পর্ক দেখে মনে হয় যেন ভারতের ভেতরেই ভারত ও পাকিস্তান লড়াই করছে! রাজনৈতিক ও জাতিগত উদ্দেশ্যে যারা দেশে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, তাদের কড়া সমালোচনা করে তিনি পরামর্শ দেন, শাসক দলের দায়িত্ব হলো দেশের বিরোধী পক্ষকে পিতা-মাতার মতো ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখা, বিদ্বেষ ছড়িয়ে রাজনীতি করা নয়।
যদিও তিনি তরুণদের জেন-জি আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করাকে সমর্থন করেননি এবং স্বাধীনতার অপব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন, তবুও তাঁর মূল তির ছিল প্রশাসনের অপশাসনের দিকেই। একসময় যিনি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে বর্তমান বিজেপি-চালিত সরকারকে ক্ষমতার মসনদে বসাতে অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেই বাবা রামদেবের মুখে ফের বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি কিন্তু দিল্লির নর্থ-সাউথ ব্লকের জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি জল অনেক দূর গড়িয়েছে? সময়ই তার উত্তর দেবে।






