কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচের অজুহাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তুতিতে একাধিক এফএমসিজি সংস্থা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১৩ আগষ্টঃ রান্নাঘরের গ্যাস থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধিতে এমনিতেই চাপে সাধারণ মানুষের সংসার। এর মধ্যেই সাবান, বিস্কুট, ডিটারজেন্ট, শ্যাম্পু ও টুথপেস্টের মতো প্রতিদিনের ব্যবহারের পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনার খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে দেশের একাধিক বড় এফএমসিজি সংস্থা তাদের নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম বাড়াতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে উৎসবের মরশুমের আগে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে ফের বাড়তি চাপ পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এফএমসিজি সংস্থাগুলির বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে পণ্যের দাম পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হচ্ছে। বিশেষ করে চিনি ও পাম অয়েলের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি সংস্থাগুলির উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির খরচও চাপ তৈরি করছে।
মুনাফার হার বা মার্জিন ধরে রাখতে তাই দাম বাড়ানোর পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে একাধিক সংস্থা। জুন ত্রৈমাসিকেই এফএমসিজি পণ্যের দাম গড়ে প্রায় ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। চলতি ত্রৈমাসিকে সেই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে সরাসরি দাম বাড়ানোই একমাত্র কৌশল নয়। ক্রেতার চোখে দাম অপরিবর্তিত রেখে প্যাকেটের ওজন বা পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। বাজারে এই পদ্ধতিই পরিচিত ‘শ্রিঙ্কফ্লেশন’ নামে।
বিস্কুটের ক্ষেত্রে এই কৌশল বিশেষভাবে নজরে এসেছে। ৫ টাকা বা ১০ টাকার প্যাকেটের দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও তার ভিতরে পণ্যের পরিমাণ বা ওজন কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে দাম না বাড়লেও একই পরিমাণ পণ্য কিনতে ক্রেতাকে শেষ পর্যন্ত বেশি টাকা খরচ করতে হবে। অর্থনীতির ভাষায় এটি সরাসরি মূল্যবৃদ্ধি না হলেও সাধারণ ক্রেতার কাছে এর প্রভাব কার্যত একই।
বরং প্যাকেটের গায়ে একই দাম দেখে অনেক সময় প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সহজে বোঝাও যায় না। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দাম না বাড়িয়ে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া কি ভোক্তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপানোর একটি পরোক্ষ পদ্ধতি হয়ে উঠছে?
ব্রিটানিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও রক্ষিত হরগভে সংস্থার আর্নিংস কলে চলতি ত্রৈমাসিকে আরও প্রভাব পড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। জুন ত্রৈমাসিকে যেখানে প্রভাব প্রায় ১ শতাংশ ছিল, সেখানে চলতি ত্রৈমাসিকে আরও ১.৫ থেকে ২ শতাংশ প্রভাব দেখা যেতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সংস্থার পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, প্রথম ত্রৈমাসিকে মূল্য সংক্রান্ত বৃদ্ধির একটি বড় কারণ ছিল ‘শ্রিঙ্কফ্লেশন’। মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একাধিক প্রয়োজনীয় পণ্য। সার্ফ এক্সেল ও রিনের মতো ডিটারজেন্ট, লাক্স ও ডাভের মতো সাবান, ক্লিনিক প্লাস ও সানসিল্কের মতো শ্যাম্পু এবং টুথপেস্টের মতো নিয়মিত ব্যবহৃত পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, একটি পরিবারের মাসিক বাজারের খরচে একসঙ্গে একাধিক পণ্যের দাম বাড়লে তার সামগ্রিক প্রভাব যে ছোট হবে না, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে স্থির বা সীমিত আয়ের পরিবারগুলির ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত ব্যয় সংসারের অন্য প্রয়োজনীয় খাতে কাটছাঁটের কারণ হতে পারে। শুধু একটি সংস্থা নয়, ডাবর ও গোদরেজ কনজিউমার প্রোডাক্টসের মতো আরও কয়েকটি বড় এফএমসিজি সংস্থাও চলতি ত্রৈমাসিকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গোদরেজ কনজিউমার প্রোডাক্টস ইতিমধ্যেই জুন ত্রৈমাসিকে তাদের পণ্যের দাম গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ বাড়িয়েছিল। ফলে একদিকে বাজারে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান দাম, অন্যদিকে সাবান, ডিটারজেন্ট, শ্যাম্পু ও বিস্কুটের মতো দৈনন্দিন পণ্যের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের সংসার পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কাঁচামালের দাম ও উৎপাদন খরচ বাড়ার বিষয়টি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্থাগুলির কাছে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হল, উৎপাদন খরচ বাড়লেই তার সম্পূর্ণ বোঝা কেন বারবার সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপবে? একদিকে সংস্থাগুলিকে উৎপাদন খরচ সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে ক্রেতার আয় একই হারে বাড়ছে না।
ফলে প্রতিটি পণ্যের দাম বা পরিমাণে সামান্য পরিবর্তনও পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাবান, বিস্কুট, ডিটারজেন্ট, শ্যাম্পু ও টুথপেস্টের মতো পণ্য বিলাসিতা নয়, এগুলি দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ।
এফএমসিজি সংস্থাগুলি বর্তমানে বর্ষার পরিস্থিতি, অপরিশোধিত তেলের দাম এবং এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের ওপর নজর রাখছে। কাঁচামালের দাম, পরিবহণ ব্যয়, জ্বালানি খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এসব বিষয়ের প্রভাব পড়তে পারে। তবে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা যাতে একতরফাভাবে সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, সে বিষয়েও নজরদারি জরুরি।
উৎপাদন খরচের বাস্তব বৃদ্ধি কতটা এবং তার তুলনায় খুচরা বাজারে কতটা দাম বাড়ানো হচ্ছে, এই হিসাব স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। কারণ, একই দামে প্যাকেটের ওজন কমানো হোক বা সরাসরি দাম বাড়ানো হোক, শেষ পর্যন্ত বাড়তি খরচের বোঝা গিয়ে পড়ছে সেই সাধারণ ক্রেতার ঘাড়েই।
সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য এই মূল্যবৃদ্ধি তাই শুধু কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ার খবর নয়; এটি ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সংসারের বাজেটের ওপর আরও একটি চাপের ইঙ্গিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নির্ধারণে সংস্থাগুলির উৎপাদন খরচের পাশাপাশি ভোক্তার স্বার্থ, মূল্যস্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া জরুরি।





