রেকর্ড মূল্যের ছ্যাঁকায় ত্রাহি ত্রাহি রব দেশের চিনির বাজারে, খোলা বাজারে দাম ছুঁয়েছে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা পর্যন্ত

একদিকে পেট্রোলে ইথানল বাধ্যতামূলক করার মরিয়া চেষ্টা, আর অন্যদিকে দেশের হেঁশেলের সবচেয়ে আবশ্যিক উপাদান, চিনির বাজারে নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি। ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষের রসনা তৃপ্তকারী চিনি আজ এক সাধারণ মধ্যবিত্তের কাছে বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ানোর উপক্রম হয়েছে। আমজনতার হেঁশেলে আগুন জ্বালিয়ে দেশের বাজারে চিনির দাম হু হু করে চড়ে যাওয়ায় তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধছে চতুর্দিকে।

ইথানলের চক্করে জর্জরিত চিনির কল, আখের টানে ফাঁকা মিলের গোডাউন, কেন এই আকস্মিক সংকট? এর নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও ভুল অগ্রাধিকার। গত কয়েক বছর ধরে পেট্রোলে ইথানল মেশানোর মাত্রা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ বা ই-২০-এ পৌঁছানোর যে মাস্টারপ্ল্যান সরকার নিয়েছে, তার জেরে রাতারাতি দেশে গজিয়ে উঠেছে অজস্র ইথানল তৈরির কারখানা।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ইথানল উৎপাদনের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কাঁচামাল হিসেবে সরাসরি প্রয়োজন হয় আখের রস। ফলে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায় চিনি মিল বনাম ইথানল কারখানার মধ্যে। ইথানল কারখানাগুলি কৃষকদের থেকে চড়া দামে আখ কিনে নেওয়ায়, চিরাচরিত চিনি মিলগুলিতে আখের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছে।

এর উপর এ বছর অনিয়মিত ও খামখেয়ালী বর্ষার কারণে দেশের কৃষিপ্রধান অঞ্চলে আখের উৎপাদনও কিছুটা মার খেয়েছে। ফলস্বরূপ, মিলগুলিতে চিনির উৎপাদন তলানিতে এসে ঠেকেছে, অথচ বাজারের চাহিদা রয়েছে আকাশচুম্বী। উৎপাদন ঘাটতি এবং কাঁচামালের এই তীব্র সঙ্কটের হাত ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারি ও খুচরা বাজারে চিনির দাম রেকর্ড ভাঙছে।

দেশের সবচেয়ে বড় চিনি হাব হিসেবে পরিচিত মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে মঙ্গলবার কুইন্টালপ্রতি চিনির দাম ছুঁয়েছে রেকর্ড ৫,৪০০ টাকা। গোটা দেশজুড়ে পাইকারি বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনির গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৫২.৩ টাকা।

সাধারণ মানুষের পকেটে সরাসরি টান মেরে দেশের বিভিন্ন শহরের খোলা বাজারে মঙ্গলবার চিনি বিক্রি হয়েছে ৫৮ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ টাকা প্রতি কেজি দরে। উৎসবের মরশুমের ঠিক আগে এই লাগামছাড়া দাম সাধারণ মানুষের পরিবারিক বাজেট সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিচ্ছে। মিষ্টির দোকান থেকে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প সব জায়গাতেই এখন দুর্ভাবনার কালো মেঘ। এই সংকটের অভিঘাত কেবল দেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে চলেছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও।

এতদিন ভারত ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান চিনি রপ্তানিকারক দেশ। বিশ্বজুড়ে চিনির মোট চাহিদার প্রায় ৮ থেকে ১২ শতাংশ জোগান দিত ভারত একা। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম থাকায় এবং বাজারে জোগান স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্র আগেই চিনি রপ্তানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফলস্বরূপ, ভারতের এই রপ্তানি বন্ধের নীতি বিশ্ববাজারের সমীকরণকেও তছনছ করে দিয়েছে, যার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারেও চিনির দাম চড়তে শুরু করেছে।

একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নীতি এমন হওয়া উচিত নয়, যেখানে একটি খাতকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য একটি অপরিহার্য খাত ধ্বংস হয়ে যায়। পেট্রোলে ইথানল মিশ্রণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে আখ চাষ এবং চিনি শিল্পকে যেভাবে সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, তাতে নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না করলে আগামী দিনে এই মূল্যবৃদ্ধি রাজনৈতিক এবং সামাজিক উভয় দিক থেকেই সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমজনতার হেঁশেলের এই চরম অস্বস্তি কাটাতে সরকার শেষ পর্যন্ত কী বিকল্প পথ নেয়, এখন সেটাই দেখার! পেট্রোলে ইথানল মিশ্রণের সরকারি নীতি এবং চিনির এই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আপনার কী অভিমত?

Related Posts

বিজেপির বোর্ড, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট কোথায়?

১০০ ভোটারের মধ্যে বিজেপির পাশে প্রায় ৩৫ জন, বিরোধী ভোট ছড়িয়েই কি গেরুয়া বোর্ডের রাস্তা পরিষ্কার? রাজু দাস, বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১১ অক্টোবরঃ শিলচর শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিজেপিকে ভোট দেননি।…

অহংকার, টিকিট-বাণিজ্য আর স্বজনপোষণের মাশুল!

নিজ গড়ে সজল আচার্যের বধ, শিলচরে কংগ্রেসের ‘রাজনৈতিক সলিল সমাধি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১০ অক্টোবরঃ কাছাড় জেলা কংগ্রেস সভাপতি সজল আচার্য এখন মুখ লুকাবেন কোথায়? নাকি আগের মতোই আবার বুক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *