আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দিসপুরে ৩৩৫ ঘণ্টার আমরণ অনশনে আরএসএস কর্মী
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ আগষ্টঃ উগ্রপন্থী সংগঠনের প্রধানকে ‘বিপ্লবী’ তকমা দেওয়া এবং প্রকাশ্যে তাঁর দেওয়ালচিত্র আঁকার আহ্বান জানানোর মারাত্মক অভিযোগে রাজ্য রাজনীতিতে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন শোরগোল। নিষিদ্ধ ঘোষিত সশস্ত্র সংগঠন আলফা (স্বাধীন)এর সর্বাধিনায়ক পরেশ বরুয়াকে নিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে এবার সরব খোদ সংঘ পরিবার!
মুখমণ্ডলে ‘হিন্দুত্ব’ ও ‘আরএসএস’-এর আদর্শ তুলে ধরা একজন মুখ্যমন্ত্রীর এমন মন্তব্যকে ‘জাতীয়তাবাদের চরম অপমান’ আখ্যা দিয়ে রবিবার, ১৬ আগস্ট থেকে দিসপুরে অসম সচিবালয়ের ঠিক বিপরীতে ৩৩৫ ঘণ্টার দীর্ঘ আমরণ অনশন কর্মসূচিতে বসছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) প্রবীণ কর্মী হিতেশ্বর চক্রবর্তী। রবিবার সকাল ১১টা থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ঐতিহাসিক অনশন ৩০ আগস্ট সকাল ১০টা পর্যন্ত টানা ৩৩৫ ঘণ্টা ধরে চলবে।
গত ১০ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এক জনসভায় প্রকাশ্যে আলফা (স্বাধীন) এর প্রধান পরেশ বরুয়াকে ‘বিপ্লবী’ বলে অভিহিত করেন। শুধু তাই নয়, উপত্যকা ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার তরুণদের বরুয়ার প্রতিকৃতি বা দেওয়ালচিত্র আঁকার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। দেশবিরোধী ও সশস্ত্র আলফা বিদ্রোহের সঙ্গে পরেশ বরুয়ার দীর্ঘদিনের যোগসূত্র এবং আসামে এই সংগঠনের হাতে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ ও নিরাপত্তাকর্মীদের রক্তের ইতিহাসের পটভূমিতে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য মুহূর্তে রাজ্য রাজনীতিতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
আরএসএস কর্মী হিতেশ্বর চক্রবর্তী এই অনশনের সময়কাল বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে উগ্রপন্থীদের হাতে নিহত সংঘ শহীদদের স্মৃতিকে তুলে ধরেছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন আলফার নৃশংসতার ভয়াবহ ইতিহাস: ১৯৯১ সালের এই অভিশপ্ত দিনটিতে বরপেটা রোডে নিষিদ্ধ আলফা জঙ্গিদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে শহীদ হয়েছিলেন সিনিয়র আরএসএস নেতা প্রমোদ নারায়ণ দীক্ষিত। ২০০৫ সালের এই দিনে নলবাড়িতে স্কুলে শিক্ষকতা করতে যাওয়ার পথে প্রকাশ্য রাস্তায় আলফা উগ্রপন্থীদের গুলিতে নিহত হন প্রমোদজির সহযোদ্ধা তথা প্রবীণ আরএসএস নেতা শুক্লেশ্বর মেধি।
হিতেশ্বর চক্রবর্তীর অভিযোগ, স্বাধিকার ও সশস্ত্র সংগ্রামের নামে আলফা জঙ্গিরা আসামে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের অজস্র দায়িত্বশীল নেতা ও নিষ্ঠাবান কর্মীকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে। যে সংগঠনের হাতে স্বজাতীয় ও দেশপ্রেমিকদের রক্ত লেগে রয়েছে, সেই সংগঠনের প্রধানকে কীভাবে একজন মুখ্যমন্ত্রী ‘বিপ্লবী’ বলে বন্দনা করতে পারেন, তা নিয়ে তীব্র ধিক্কার জানান তিনি। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আরএসএস কর্মী চক্রবর্তী রাজ্যের প্রশাসনিক ডবল স্ট্যান্ডার্ড বা দ্বিমুখী নীতির প্রতি তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সামাজিক মাধ্যমে আলফার সমর্থনে স্রেফ একটি কবিতা লেখার অপরাধে যদি এক নিরীহ তরুণীকে গ্রেপ্তার করে হাজতে পুরতে পারে আসাম পুলিশ, তবে প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ সশস্ত্র সংগঠনের প্রধানের দেওয়ালচিত্র আঁকার প্রচার চালানোয় মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কেন কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? জাতীয় নিরাপত্তার চরম স্বার্থে অবিলম্বে পরেশ বরুয়াকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে গ্রেপ্তার করার উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে না?
মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের জন্য ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে অবিলম্বে প্রকাশ্য জনসমক্ষে ক্ষমা চাওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন চক্রবর্তী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঙ্কার দিয়েছেন, যদি মুখ্যমন্ত্রী নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন, তবে নৈতিকতার খাতিরে ও সাংবিধানিক পদের মর্যাদা রক্ষায় তাঁর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।
হিন্দুত্ব ও আরএসএস আদর্শের প্রতি প্রকাশ্যে আনুগত্য দেখানো এবং একই সঙ্গে সার্বভৌমত্ববিরোধী আলফা প্রধানের মহিমাকীর্তন করার এই স্ববিরোধিতাকে রাজ্যের মানুষের সামনে উন্মোচিত করাই দিসপুরের এই ৩৩৫ ঘণ্টার অনশনের মূল উদ্দেশ্য। স্বাধীনতা দিবসের ঠিক পরদিনই দিসপুর সচিবালয়ের সামনে সংঘ কর্মীর এই আমরণ অনশন ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকারকে যে চরম নীতিগত ও রাজনৈতিক অস্বস্তির মুখে ফেলে দিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।






