অপরাধী পার পাবে না, মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পালের হুঁশিয়ারি, শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান মন্ত্রীর
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শ্রীভুমি ১৫ আগষ্টঃ নিখোঁজ হওয়ার দুদিন পর অবশেষে মিলল বিজেপি বুথ সভাপতির ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম চাঞ্চল্য ও থমথমে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে বাজারিছড়া ও পার্শ্ববর্তী সীমান্ত এলাকা জুড়ে। বাজারিছড়া থানার ছাগলমোয়া গ্রামের বাসিন্দা তথা শাসকদলের বাহান্ন বছর বয়সী বুথ সভাপতি বিকাশ ধরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ত্রিপুরা সীমান্তসংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে ফেলে রেখেছিল দুষ্কৃতীরা। শেষ পর্যন্ত জঘন্য এই হত্যাকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে মূল মাস্টারমাইন্ডসহ মোট ছয়জন খুনিকে জালে তুলেছে পুলিশ। তবে আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে এনকাউন্টার চালাতে হয়েছে পুলিশকে।
স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুরে একটি অজ্ঞাতপরিচয় ফোন কল পাওয়ার পরপরই বিকাশ ধর তাড়াহুড়ো করে নিজের মোটরসাইকেলটি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। পরিবারের লোকজনকে বিশেষ কিছু জানাননি তিনি। এরপর সময় গড়ালেও তিনি আর বাড়ি ফিরে আসেননি। তাঁর মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ বা সুইচড অফ পাওয়া যায়।
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার থেকে। নিজ এলাকা থেকেই আচমকা নিখোঁজ হয়ে যান সক্রিয় বিজেপি নেতা বিকাশ ধর। সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে পরিবার। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়।

বৃহস্পতিবারই পরিস্থিতি অনুধাবন করে নিখোঁজ বিকাশ ধরের বাড়িতে ছোটেন পাথারকান্দির বিধায়ক তথা রাজ্যের জনস্বাস্থ্য কারিগরি, পার্বত্য অঞ্চল ও বরাক উপত্যকা উন্নয়ন বিভাগের প্রভাবশালী মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল। শোকার্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের আশ্বস্ত করেন তিনি। এরপরই শ্রীভূমির সিনিয়র পুলিশ সুপার লীনা দোলে সহ জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের তলব করে বিকাশ ধরকে দ্রুত উদ্ধারের জন্য কড়া নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
মন্ত্রীর নির্দেশের পর নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। এসএসপি লীনা দোলের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে শুরু হয় চিরুনি তল্লাশি। অবশেষে শুক্রবার যোগীছড়ার জনমানবহীন এক পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় বিকাশ ধরের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ। রক্তভেজা লাশ উদ্ধারের খবর চাউর হতেই কান্নার রোল ওঠে পরিবারে, আর আছড়ে পড়ে গণক্ষোভ। বিকাশ ধরের খুনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাজারিছড়ায় আগুন জ্বলে ওঠে। শান্ত এলাকা নিমেষে অশান্ত হয়ে পড়ে। উত্তেজিত জনতার একাংশ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে স্থানীয় কয়েকটি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিমেষে ছড়িয়ে পড়ে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উত্তাপ।

খবর পেয়েই অকুস্থলে পৌঁছান এসএসপি লীনা দোলে ও বিশাল পুলিশ বাহিনী। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে কোনোমতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে প্রশাসন। মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে পুলিশ কালবিলম্ব না করে ছয়জন সন্দেহভাজনকে আটক করে।
কিন্তু অভিযানের মাঝেই ঘটে এক নাটকীয় মোড়! আটক হওয়া আব্দুল হক নামে এক অভিযুক্ত পুলিশের হাত ফসকিয়ে চম্পট দেওয়ার চেষ্টা করে। তাকে রুখতে শূন্যে ও পরবর্তীতে সরাসরি গুলি চালাতে বাধ্য হয় পুলিশ। পায়ে গুলি লেগে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে আব্দুল। বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে।

ঘটনার পর শ্রীভূমি জেলা জুড়ে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে শ্রীভূমি জেলা বিজেপি। জেলা বিজেপি সভাপতি সঞ্জীব বণিক, রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ মিশন রঞ্জন দাস এবং প্রাক্তন জেলা সভাপতি সুব্রত ভট্টাচার্য এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের চরম ধিক্কার জানিয়েছেন। শোকের ছায়া ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে শুক্রবার জেলা বিজেপির সমস্ত পূর্বনির্ধারিত দলীয় কর্মসূচি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান জেলা সভাপতি সঞ্জীব বণিক।
অন্যদিকে, এলাকায় শান্তি বজায় রাখার আকুল আবেদন জানিয়েছেন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল। তিনি সাফ জানান, অপরাধী যেই হোক, কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় তাকে বাঁচাতে পারবে না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আমি সাধারণ মানুষের কাছে শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার অনুরোধ জানাচ্ছি।
বিকাশ ধরকে কেন এমন নৃশংসভাবে বলি হতে হলো? এর নেপথ্যে কি পুরনো কোনো রাজনৈতিক শত্রুতা, নাকি অন্য কোনো গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে? এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে শ্রীভূমির বাতাসে। আপাতত বাজারিছড়া ও যোগীছড়া এলাকায় কড়া টহল দিচ্ছে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। আপাতদৃষ্টিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও ছাইচাপা আগুনের মতো জ্বলছে চাপা আতঙ্ক ও ক্ষোভ।
শ্রীভূমি পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এবং ধৃতদের জেরার পর খুনের প্রকৃত কারণ পরিষ্কার হবে। তবে একজন বুথ সভাপতির এমন নৃশংস পরিণতি প্রশাসনিক নজরদারি ও স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিল। ঘটনায় পুরো বাজারিছড়া জুড়ে এখনো চরম থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। মৃতের পরিবারের যাতে কোনোভাবেই বিচারবঞ্চিত হতে না হয়, তার জন্য নিবিড় ও কঠোর আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচার করে বিকাশ ধরের খুনিদের দ্রুত ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাতে হবে।





